সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীর মন

১। সমরেন্দ্র স্যান্যাল

কলকাতার উচ্চতম বিল্ডিং আর্বানা ১০-এর মাথার উপর একটি চপার ঘুরপাক খেতে খেতে নামছিল। আর হেলিপ্যাডের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন কলকাতা পুলিসের ডিসি সমরেন্দ্র স্যান্যাল এবং তার ব্যক্তিগত আধিকারীক কর্পুর ধর। এই উচ্চতা থেকে ইন্স্যুলেটেড শহরটার প্রায় পুরোটা দেখতে পাওয়া যায়, এমনকি সন্তোষপুর থেকে নো ম্যান্‌স ল্যান্ডটা এবং তারও আড়াই মাইল দূরে ঝাপসা শহরঘেরা তারের ওয়ালটাও। কর্পুরের ভার্টিগো আছে, সে নিচের দিকে তাকায় না। কিন্তু সমরেন্দ্র ঠিক করলেন চপার যতক্ষণ না নামে তিনি উড়ন্ত যানটার দিকে তাকিয়ে থাকবেন না – চাকর-বাকরের মত দেখতে লাগে, দেবতার অবতরণ ঘটছে তার দিকে হ্যাংলার মত হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ভক্তের মত। তিনি তাই বিল্ডিং-এর ধার ঘেসে তাকিয়ে থাকলেন শহরটার দিকে।

Continue reading “সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীর মন”

Advertisements

রিখি এবং লিঙ্গোপেনের অপার্থিব সঙ্গীত

ইনস্যুলেটেড কলকাতার মধ্যশহরে – অর্থাৎ সল্ট লেক সিটির দ্বিতীয় উচ্চতম অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর চোদ্দতলার নির্বাসনে – হ্যাকার সুহৃদ মন্ডল বুঝতে পারছেনা সে তারকাখচিত অন্ধকার শহরের দিকে তাকিয়ে আছে না তার ল্যাপটপের হলোগ্রাফিক আয়তক্ষেত্রের দিকে। সে তো আর কয়েকদিনের জন্য হ্যাকার।
আর এই কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে বস্তার নিয়ে উপন্যাসটিও লিখে ফেলতে হবে। কারণ যতদিন হ্যাকার থাকতে পারবে সে, ঔপন্যাসিক হওয়ার সম্ভাবনাও ততদিনের। শুধু সে বুঝতে পারছেনা তার বস্তার নিয়ে উপন্যাসটা হিস্টোরিকাল ফ্যান্টাসি হবে না কল্পবিজ্ঞান।
সে আর কয়েকদিনের জন্যই হ্যাকার – কারণ সুহৃদ বুঝেছে যে তার বুকের পাটা ফুরিয়েছে। তার একটা পা জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই দূর্বল, তার পক্ষে এই শহরকে বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ও ইনস্যুলেটেড করে রেখেছে যে কয়েক মাইলের সুরক্ষিত জলাভূমি আর তারপর যে বিশতলা উঁচু তারের দেওয়াল, তা পেরোনো কোনদিনই সম্ভব নয়। Continue reading “রিখি এবং লিঙ্গোপেনের অপার্থিব সঙ্গীত”

ট্রিন-টি আর সেই লোকটা

প্রায় ভোররাতের দিকে তরুণ সৈনিকটি এই দেশের শেষতম স্টেশনটিতে এসেছিল। সেই সন্ধ্যে থেকেই ভারি, হালকা, ঝিরঝিরে – বিভিন্ন মাত্রার বৃষ্টি পড়ে চলেছে।
ও একা আসেনি, পুরো রেজিমেন্টটাই এসেছে। আর দূরে একগাদা গ্রাম্য গরীবের ভিড় তাকিয়ে আছে ওদের দিকে – তাদের মধ্যে একটি বালিকা আছে বছর সাতেক বয়সের। তার নাম ট্রিন-টি। তরুণ সৈনিকটির নাম এই গল্পে প্রয়োজনীয় নয়, সে একটি নাম্বার মাত্র।
প্রায় দশটি সামরিক ট্রাক বোঝাই হয়ে এলো ঘন্টা দেড়েক পরে। রেজিমেন্টের সবার বন্দুকের সেফটি ক্যাচ অন না করে রাখতে বলা হয়েছিল। অমোঘ সময়ে প্রয়োজন হলে সত্তরখানি স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের হার্মোনাইজ্‌ড ক্লিক শুনতে ভালোবাসেন কর্পোরেশনের কমান্ডার। কিন্তু আমাদের তরুণ সৈনিকটি একবার বিদ্যুৎ গর্জে ওঠার সময়ে সেই ক্লিকটির শব্দ আড়াল করে নিয়েছিল। ট্রিন-টির শ্রবণশক্তি প্রায় কুকুরের মত – সে অন্য মানুষের চাইতে বেশি শুনতে পায়, অনেক শব্দের মধ্যে একটি শব্দ তুলে নিয়ে আসতে পারে – সে ক্লিক শুনতে পেয়েছিল। আর তখন, যেহেতু অতগুলো সৈন্যর মধ্যে মাত্র একজনই ‘ক্লিক’ করেছে, তার দিকে ঠায় তাকিয়ে ছিল ট্রিন-টি। Continue reading “ট্রিন-টি আর সেই লোকটা”

আর্শি নগর

ঢাকুরিয়া ব্রিজের মাঝবরাবর হাঁ করা ভাঙা জায়গাটায় ওরা তিনজন বসে পা দোলাচ্ছিলো – গগন, ছিদাম আর ইউসুফ। নিচে রেললাইনটার উপর ঝুঁকে পড়েছে একটা বটগাছ – কি আজবভাবে জন্মিয়ে, বেড়ে, ডালপালা মেলে টিকে গেছে এমন যুগে যখন গাছপালা টিকতে পারেনা খুব একটা; যদিও পাতাগুলো সবুজ নয় ঠিক, সবজে বাদামী বলা যায়।
রাত এখন সাড়ে তিনটে – ওদের কর্মবিরতি রাতের এই কয়েক ঘন্টাই আর দুপুরবেলা এক ঘন্টা। আকাশে মেঘের সেই চিরকালীন ঘনঘটা, অনেক উঁচুতে এক আধটা বিদ্যুৎ খেলতেও দ্যাখা যায়। ছিদাম বললো যে ওরা যে ব্রিজের সবচাইতে উঁচু জায়গাটায় বসে আছে, বাজ যদি মাথায় এসে পড়ে? ইউসুফ ভর্ৎসনা করে – বলে যে আশেপাশের বাড়িগুলো অনেক উঁচু – বাজ পড়লে ওই দিকে টাল খেয়ে যাবে।
“আর মরলেই বা কি যায় আসে?” – গগন বললো।
“মাপ কর ভাই – আমার মরার ইচ্ছে নেই।”
“এভাবে বাঁচবি?” – গগন জিগ্যেস করে।
“আমার নালিশ নেই কোনো। পেট চালাতে গেলে লোকেদের কাজ লাগে। আমিও কাজ করে চলেছি ভাই, গ্রামের বাড়িতে বৌ-মা-বাবা আছে, টাকা পাঠাতে হয়।” Continue reading “আর্শি নগর”