Review by Shan Bhattacharya

Review by Shan Bhattacharya

“বাংলায় উচ্চমার্গের কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য পড়তে পারা আর বনগাঁর আকাশে অরোরা দেখা প্রায় একই ব্যাপার। মনেপ্রাণে চাই, কিন্তু বাস্তবে পেতে গেলে জিভের তলায় বুদ্ধ দিতে হবে। বাংলায় কল্পবিজ্ঞানের নামে অল্পবিস্তর যেটুকু লেখালিখি হয় তা এড়িয়ে চলি এই কারণেই। তাছাড়া বয়েস মধ্য তিরিশে এসে ঠেকেছে, হাতে সময় খুব কম। তবু অনিন্দ্য সেনগুপ্তর সাম্প্রতিকতম লেখা “অপার্থিব” উপন্যাসটি হাতের সামনে পেয়ে পড়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। তার প্রধান কারণ দুখানা – ১- অনিন্দ্যবাবুর সাথে সোশাল মিডিয়াতে যুক্ত হওয়ার সুবাদে ওনার মতামতের সাথে আমি পরিচিত, এবং মাঝেমধ্যেই একমত হয়ে থাকি। ২- কয়েকজন বন্ধুবরের recommendation.

যাই হোক, সোয়া একশ পাতার বই, ডিনারের পর ঘুম আসার আগেই ঝাড়া পড়ে ফেলা উচিত। কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখলাম গল্পটা আসলে ইংরিজিতেই লেখা, তারপর স্রেফ বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। এবং সেই বাংলার ভাষাশৈলী অনেকটা ছোটবেলায় পড়া বিদেশী নভেলের খারাপ অনুবাদের মত। যাই হোক, দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমাদের মত কল্পবিজ্ঞানপ্রেমীদের ভাষা নিয়ে অত মাড়ালে চলে না। ভেতরে মালটা কি আছে সেটাই মূল আকর্ষণ। এরপর সাহিত্যগুণ দেখতে গেলে ঠগ বাছতে গ্রাম উজাড় হয়ে যাবে। তাছাড়া আমার প্রিয় কল্পবিজ্ঞান লেখকদের মধ্যে অনেকেরই লেখার শুধু ইংরিজি অনুবাদ পড়েছি, এবং সে অনুবাদের ভাষাশৈলীও বলার মত নয়।

আমি যেটুকু পড়েছি, তাতে দেখেছি খুব সহজ করে বলতে গেলে কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য মূলতঃ তিন রকমের হয়। এক, যেখানে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই গল্পের key elements তৈরি করে। এতে সাধারনতঃ গল্পের একটা বড় অংশ জুড়ে technical explanations রাখতে হয়, লেখনীর গুণে যা অনেকসময়ে সুখপাঠ্য হয়ে থাকে। কিন্তু নেহাতই গল্প হিসেবে সেগুলো খুব জটিল হয়ে ওঠে না। দুই, যেখানে গল্পটির গভীরতা, তার রাজনীতি ও দর্শনই হল মূল আলোচ্য বিষয়। শুধু সেটা উপস্থাপনা করা হয় একটা হালকা কল্পবিজ্ঞানের আঙ্গিকে (অথবা বলা ভাল, বিজ্ঞান-বিজ্ঞান শোনায় এরকম ফ্যান্টাসির আঙ্গিকে)। তিন, এই দুইয়ের যথাযথ সংমিশ্রণ। আমার পছন্দের বেশীরভাগ এই গোত্রেই পড়ে। একটা চতুর্থ ক্যাটেগরি আছে, trash sci-fi, যেটা আসলে মিলিতভাবে প্রথম দুটো টাইপের anti-thesis, উদ্দেশ্য নিছক বিনোদন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই আশ্চর্যরকমের রাজনৈতিক স্বাবলম্বিতার পরিচয় দেয়। অনিন্দ্যবাবুর উপন্যাসটিকে দ্বিতীয় গোত্রেই ফেলা যায়, যদিও এই ধরনের গল্পে বৈজ্ঞানিক আলাপচারিতা (science talk) যতটা প্রয়োজন হয় এখানে তার থেকে কিঞ্চিৎ বেশীই আছে, আমার মতে সেটার অধিকাংশই আলংকারিক।

এখন সত্যি কথা বলতে, আধুনিক কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য এই চার গোত্রের দেয়াল ভেঙ্গে অনেকদিন আগেই বেরিয়ে এসেছে। চলচ্চিত্র জগতে অপার জনপ্রিয়তার কারণে বিগত ৪/৫ দশকে জঁর হিসেবে কল্পবিজ্ঞানে অনেক trope আর plot template এর আমদানি হয়েছে। একবিংশ শতকে কল্পবিজ্ঞানের বই লিখতে বসলে একথা ধরেই নেওয়া হয় যে পাঠক/পাঠিকারা কতগুলো very basic motif-এর সাথে পূর্বপরিচিত – hibernation, interstellar travel, time warp, spaceship AI, dystopic future ইত্যাদি ইত্যাদি। আজকালকার নামজাদা কল্পবিজ্ঞান লেখকেরা এই motifগুলোর পেছনে বেশী science talk খরচ না করে তাই চলে যান এর further explorationএ। কল্পবিজ্ঞানের ‘কল্প’অংশটি তাই আর এগুলোর উপর নির্ভর করে না, কল্পবিজ্ঞান পড়তে বসে পাঠকপাঠিকারা এগুলোকে reality’র মতই ভাবেন।

এখানেই ‘অপার্থিব’র প্রথম দুর্বলতা। লেখক অনেক গুছিয়ে, অনেক চলচ্চিত্র ও সাহিত্য থেকে দৃশ্য ধার নিয়ে, অনেক শব্দ খরচ করে ধৈর্যসহকারে শেষমেশ এই পুরনো মোটিফগুলোই তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে তাঁর কাহিনীর ‘বিজ্ঞান-বিজ্ঞান’ সেটিংটাকে উপস্থাপন করার জন্য। শুরুতে গল্পের নায়ক ও চিফ কম্যান্ডারের কথোপকথন, হাইবারনেশন, মহাকাশযানের AI-এর খেয়ালখুশি, wormholeএর তত্ত্ব, নায়কের সাথে ভিলেন কর্পোরেটদের সম্পর্ক, নতুন প্রাকৃতিক সুন্দর virgin গ্রহ, হ্যাকিং ও কোডিং বিষয়ক হালকা আলাপচারিতা – এর সবকিছুই এত পূর্বপরিচিত এবং নতুনত্বহীন যে তারা গল্পে নিছক অলংকারের বাইরে আর কোনও কাজে আসে না। spoiler না দিয়ে বলতে পারি – গল্পের যে মূল plot twist, সেটাও লেখা আর সিনেমা মিলিয়ে নিদেনপক্ষে দশবার আগে দেখেছি। এতে দোষের কিছু নেই, fiction অনেকাংশে নির্ভর করে পুরনো fiction কে রেফার করার উপরেই। কিন্তু সেখানে গল্পকারের দায় থেকে যায় রেফার করা অংশটিকে further কোথাও নিয়ে যাওয়ার। সেটা অংশটির detailing এর উপর হতে পারে, তার মূল বক্তব্যের subversion করার উপর হতে পারে, বা context এর বদল ঘটিয়ে করা যেতে পারে। আজকালকার কল্পবিজ্ঞান লেখকেরা এই তিনটে জিনিসই হামেশাই করে থাকেন। এবং তিনটে করতেই প্রবল কল্পনাশক্তির প্রয়োজন হয় (মূল কল্পনাটি অরিজিনাল না হওয়া সত্ত্বেও)। শ্রীসেনগুপ্তর লেখা পড়তে গিয়ে কোথাও সেই কল্পনাশক্তির আভাস খুঁজে পাই না। বিন্যাস, চরিত্রায়ন, দৃশ্যায়ন, ঘটনাপ্রবাহ – সবই আগে পড়া বা আগে দেখা। পড়তে পড়তে লেখকের ছেড়ে রাখা ছোটখাটো reference আবিষ্কার করে তাঁর জ্ঞানের তারিফ করাই যায়, কিন্তু মূল বিষয়টি কল্পনাশক্তির অভাবে hackneyed লাগে।

থাকল পড়ে রাজনীতি আর দর্শন। উপন্যাসের অনেকটাই খরচ করা হয়েছে দুজন বা তিনজন চরিত্রের মধ্যে কথোপকথন বর্ণনা করে। বস্তুতঃ সেভাবে দেখতে গেলে কোথাও কোথাও এই উপন্যাসের এই অংশগুলো এতটাই detailed, আর অন্য descriptive জায়গাগুলো এতই দায়সারা, যে বাকি গল্পের ঘটনাপ্রবাহকে স্রেফ এই আলোচনাগুলো উত্থাপন করার ছুতো বলে মনে হয়। তাতে অসুবিধের কিছু নেই, খোদ আসিমভের অধিকাংশ উপন্যাসই এরকম। শ্রীসেনগুপ্তর রাজনৈতিক বোধ ও দর্শনের ছাপ এই আলোচনাগুলির মধ্যে দিয়ে প্রকট হয়ে ওঠে, এই ২০১৭তে বসে তার সাথে রিলেটও করা যায়, এবং সেটাই এই উপন্যাসটিকে আর পাঁচটা শিশু/কিশোরপাঠ্য ঢপের কল্পবিজ্ঞানের থেকে আলাদা সারিতে বসায়, যদিও গল্পের উৎকর্ষ বা প্রবাহকে তারা খুব একটা যে সাহায্য করে তা জোর দিয়ে বলা যায় না। Fiction লেখা, তায় আবার science fiction, তার জন্য লেখনী, রাজনীতিবোধ, দর্শনচেতনা, প্রবল পড়াশোনা ছাড়াও যেটা খুব বেশীমাত্রায় লাগে তা হল কল্পনাশক্তি। বাকিগুলো অভ্যাস দিয়ে গড়ে তোলা যায়, কিন্তু কল্পনাশক্তিকে ওভাবে গড়ে তোলা যায় কিনা আমার জানা নেই। শুনেছি ফিলিপ কে ডিক তাঁর উদ্ভট কল্পনার অনেকটাই পেতেন নেশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে। আবার কোনি উইলিস কোনকালে কোনও নেশা করেননি।

যাই হোক, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটা mature themeএর কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস বাংলায় লেখার উদ্যোগ নেবার জন্য অনিন্দ্যবাবুকে সাধুবাদ জানাই।”

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s