Review by Riju Ganguly

‘অপার্থিব’-র প্রথম রিভিউ বেরিয়েছে অবসর ডট নেট-এ। আলোচনা করেছেন ঋজু গাঙ্গুলী

‘বৈভাষিক’ নামক প্রকাশনা থেকে, অভীক কুমার মৈত্রের চমৎকার প্রচ্ছদে শোভিত হয়ে, মে ২০১৭-য় প্রকাশিত হয়েছে ১২৮ পৃষ্ঠার এই হার্ডকভারটি।

ইতিপূর্বে আলোচিত বইটির লেখকের মতো এই বইয়ের লেখক, অর্থাৎ শ্রী সেনগুপ্ত-ও পেশাদার লেখক নন। মূল উপন্যাস শুরুর আগে অভিজিৎ গুপ্ত কর্তৃক লিখিত একটি অমূল্য ‘অবতরণিকা’, এবং উপন্যাসের শেষে লেখকের সৎ ও আন্তরিক ‘উত্তরকথা’, এই দুটি অংশই প্রমাণ করে দেয়: এই বই ব্যবসায়িক প্রেরণা, বা লেখক হিসেবে নাম কেনার অপচেষ্টা-সঞ্জাত নয়, বরং কল্পবিজ্ঞান তথা জঁর ফিকশনের প্রতি ভালোবাসা, এবং মাংসের বদলে মস্তিষ্কের কাছে আবেদন করার তাগিদ, এই দুই আবেগানুভূতির ফলেই চলচ্চিত্র বিভাগের অধ্যাপক শ্রী সেনগুপ্ত এই উপন্যাসটি লিখেছেন।

কথাটা একই সঙ্গে আনন্দের, ও ভয়ের।

আনন্দের, কারণ কল্পবিজ্ঞান চর্চাকে ‘ধূম মচিয়েছে’ বা ‘কেন কী’ স্তরের লঘু গদ্য, এবং কাকাবাবুর ছেঁড়া স্যুটকেসে টাইম ট্র্যাভেলের চাবিকাঠি খুঁজে পাওয়ার প্লটের থেকে ওপরে তুলতে গেলে প্রয়োজন উচ্চ মেধা, এবং অধীত প্রজ্ঞা ও সচেতনতার লজ্জাহীন বৌদ্ধিক উন্মেষ। কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যকে ফ্যান্টাসির সঙ্গে একাকার করে দিয়ে তাকে বালখিল্য স্তরে নামানো, যাতে মুড়ি ও মিছরি দুজনেরই দর সেই হাটে এক হয়, বাংলা সাহিত্যকে ইতিমধ্যেই নীরক্ত করে দিয়েছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এমন এক নিপাট “অয়ম অহম ভোঃ” শুনলে আশা জাগে বইকি।

ভয়ের, কারণ বিদেশি সিনেমার ভাষায় দীক্ষিত অধিকাংশ বাঙালির মতোই শ্রী সেনগুপ্ত বাংলা লেখেন ইংরেজিতে। নমুনা পেশ করা যাক কয়েক পিস:

“আমার ইচ্ছের বা সম্মতির কোনো সুযোগ ছিল না বলাই বাহুল্য, কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশীদার যে সামাজিক রেপেল্যান্ট আমি, তার কাছে চয়েস বলে বাহুল্যটি থাকে না খুব একটা”,
বা,
“এই নির্বাসনের বিকল্পে মঙ্গলের কারাগারে যে নির্বাসন আমার কপালে ছিল তা যে কতটা যন্ত্রণাদায়ক হত সেই নিয়ে চিফ কমান্ডার যখন জ্ঞানগুলি দিচ্ছিলেন সেই বক্তৃতাকে আমার খ্রিশ্চান সারমনের নরকদশা সম্পর্কিত হুমকির মতোই শুনতে লাগছিল”,
এবং,
“পরবর্তী চাঞ্চল্য ও রহস্য সমাধানের গল্প উহ্য রেখে বলা যায় যে এই নিশ্চিত তথ্যে পৌঁছোনো গিয়েছিল যে বুধের অদূরবর্তী একটি স্থানে ভয়েজার – ৩ একটি ওয়ার্মহোলের সম্মুখীন হয়েছিল – … -যে সুড়ঙ্গমুখ থেকে বেরিয়ে ভয়েজার – ৩ মানুষকে একটি টাটকা নতুন তারকামণ্ডলের খবর পাঠাতে আরম্ভ করেছিল”।

এই বাক্যগুলো পড়ে আপনি যদি শিবনেত্র হয়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না। তবে আমি কেসটা বুঝেছিলাম। মাথার মধ্যে ভাবনাগুলো ইংরেজিতে এলে বাক্যগুলোও ফিউচার ইনডেফিনিট আর স্প্লিট ইনফিনিটিভ হয়ে যায়, ফলে কথাগুলো বেরোয় আমাদের চেনাজানা কলা বা আপেলের বদলে ডুরিয়ান হয়ে। তবে এই ‘ইংলা’-তে একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে, এবং লেখকের নিজের ভাষাটাও সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে অনেকটা বাংলা হয়ে এলে আপনি যে কাহিনির মধ্যে প্রবেশ করবেন তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আক্ষরিক অর্থে অভূতপূর্ব, এবং অসমসাহসিক এক প্রয়াস।

হ্যাঁ, এতেও আছে পৃথিবী থেকে ৪.২৪ আলোকবর্ষ দূরের এক মনুষ্য বসবাসোপযোগী গ্রহ ‘করোনা’-তে বৈজ্ঞানিকদের পাঠিয়ে প্রথমে গবেষণা, এবং পরে তার সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা। কিন্তু তা বাদে এই গল্প বাংলা ভাষায় ভিনগ্রহ ও ভিনগ্রহীদের নিয়ে লেখা যেকোনো তথাকথিত অ্যাডভেঞ্চারের থেকে আলোকবর্ষ দূরে দাঁড়িয়ে আছে, সগর্বে।

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরের যে ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীর বুকে এই ঘটনা ঘটেছে তার কাল্পনিক, অথচ যেকোনো সংবেদী মানুষের রক্তকণিকায় আতঙ্কের কাঁপন তোলা বিবরণ এখানে এসেছে নায়ক দারিয়াস মজুমদারের টুকরো-টুকরো কথা আর স্মৃতির মাধ্যমে। সেই বিবরণ কাল্পনিক হয়েও কোথায় যেন ভয়ঙ্কর রকম সত্য, কারণ ‘আমাদের’ সময়ের ঘটমান বর্তমান থেকে সেই অনাগত ভবিষ্যতের মাঝের পথটার যে ছবি অল্প আঁচড়ে এঁকেছেন লেখক, তার সর্বাঙ্গে অনুরণিত হচ্ছে কালের যাত্রার ধ্বনি।

সেই পৃথিবীতে, যার সিংহভাগ ৮টি যুযুধান কর্পোরেশনের দখলে, কর্পোরেশনের চোখে অ্যানার্কিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট এক দুর্ধর্ষ হ্যাকার হল দারিয়াস মজুমদার। মঙ্গলের জেলে পচার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার একটা পথ হঠাৎ করে তার সামনে খুলে গেল, যখন একটি কর্পোরেশন তাকে নির্বাচিত করল একটি মিশনের জন্য।
যে-সে মিশন নয়, রীতিমতো সত্যানুসন্ধান, এবং অপরাধীকে চিহ্নিত করে নিকেশ করার মিশন নিয়ে দারিয়াস রওনা হল করোনা গ্রহের দিকে, যেখানে পাঠানো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীরা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন হয়ে যাচ্ছেন হঠাৎ করেই, আর তারপর মারা যাচ্ছেন।

দারিয়াসকে বের করতে হবে, কী ঘটছে ওই গ্রহে?

আজীবন কর্পোররেশনের দানবিক নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে লড়ে চলা দারিয়াস কি পারবে এই গ্রহের, তথা বিজ্ঞানীদের এই অদ্ভুত পরিবর্তনের রহস্যভেদ করতে?
ঠিক কী জানতে পারবে সে নিজের অনুসন্ধিৎসা, শ্রম, ভালোবাসা, এবং জীবন দিয়ে?

রং চড়ানো ফ্যান্টাসি নয়, বরং জীবন, শরীর, ও অস্তিত্বের অনুসন্ধানের এই গভীর, বহুমাত্রিক, এবং হু/হোয়াই/হাউ-ডান-ইট ছাপানো কাহিনিটি রচিত হয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক তথা প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের কথা মাথায় রেখেই, যা বাংলা ভাষায় বিরল, কারণ জঁর ফিকশন, বিশেষত কল্পবিজ্ঞান এখানে এখনও ‘ছোটোদের’ জন্যই সংরক্ষিত।
১৮০/- টাকা দামটা বেশি লাগছে ভেবে এই বইটি যদি না পড়েন, তাহলে শুধু যে বাংলায় মৌলিক কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শনটিকে পড়া থেকে বঞ্চিত হবেন তাই নয়, আমের বদলে মাকাল ফলে বাজার ভরার পথটিও কিন্তু অপ্রত্যক্ষ ভাবে প্রশস্ত করবেন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s