সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীর মন

১। সমরেন্দ্র স্যান্যাল

কলকাতার উচ্চতম বিল্ডিং আর্বানা ১০-এর মাথার উপর একটি চপার ঘুরপাক খেতে খেতে নামছিল। আর হেলিপ্যাডের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন কলকাতা পুলিসের ডিসি সমরেন্দ্র স্যান্যাল এবং তার ব্যক্তিগত আধিকারীক কর্পুর ধর। এই উচ্চতা থেকে ইন্স্যুলেটেড শহরটার প্রায় পুরোটা দেখতে পাওয়া যায়, এমনকি সন্তোষপুর থেকে নো ম্যান্‌স ল্যান্ডটা এবং তারও আড়াই মাইল দূরে ঝাপসা শহরঘেরা তারের ওয়ালটাও। কর্পুরের ভার্টিগো আছে, সে নিচের দিকে তাকায় না। কিন্তু সমরেন্দ্র ঠিক করলেন চপার যতক্ষণ না নামে তিনি উড়ন্ত যানটার দিকে তাকিয়ে থাকবেন না – চাকর-বাকরের মত দেখতে লাগে, দেবতার অবতরণ ঘটছে তার দিকে হ্যাংলার মত হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ভক্তের মত। তিনি তাই বিল্ডিং-এর ধার ঘেসে তাকিয়ে থাকলেন শহরটার দিকে।

আর এই পঞ্চাশ বছর আগে আটকে থাকা শহরটায় থাকা যাচ্ছেনা, সমরেন্দ্রর মনে হল। যখন ইনকর্পোরেশন হয় তখন তিনি ভ্রুণ, তার বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে এখানে থেকে যাওয়াই ভালো, অন্তত খাওয়া-পরা-বাসস্থান-চিকিৎসার দুশ্চিন্তাটা তো যাবে, নাই বা হল বাকি জীবনটায় শহর থেকে বেরোতে না পারা। তার আত্মীয়রা কলকাতাতেই বেশিরভাগই; শ্বশুরবাড়ি বীরভূমে, তাই স্ত্রী কেঁদে ভাসাচ্ছিলেন পোয়াতি অবস্থায়। সমরেন্দ্রর বাবার পক্ষে সম্ভব হয়নি, কিন্তু সমরেন্দ্র পঁচিশ বছর পর সিপিএসে উত্তীর্ণ হওয়ার দুইমাসের মধ্যেই পারমিট যোগাড় করে বিধবা মাকে শহর থেকে মুক্ত করেছিলেন। মাকে বুঝিয়েছিলেন যে তিনি প্রশাসনের মধ্যে আছেন, তার পক্ষে নিশ্চয়ই শহর থেকে বেরিয়ে দেখা করে আসা সম্ভব হবে। সম্ভব হয়নি; পাঁচ বছরের মধ্যে মায়ের মৃত্যুসংবাদ আসে। শ্রাদ্ধ-সৎকার করতে হলে ইনভিজিলেশন ঘাড়ে করে যেতে হবে, সমরেন্দ্র যাননি কলকাতা থেকে ভারতবর্ষে।

তারপর বাকিটা জীবন স্রেফ খেটে গেছেন – একদিন না একদিন পারমিটের যোগ্য হবেন এই আশায়। একদিন ভুলেই গেছেন যে প্রিয়াম কর্পোরেশনের অধীনে এই মেট্রোপলিসের বাইরে কোথায় তার যাওয়ার জায়গা হতে পারে। তারপর পারমিটের লক্ষ্য ঝাপসা হয়ে গেলে অভ্যেসের বশেই খেটে গেছেন। ইদানিং আবার খিদেটা চাগাড় দিয়ে উঠছে – বেরিয়ে যেতে হবে। তিনি জানেন যে ২০৩০ সালের পর পৃথিবীটা কিভাবে পাল্টেছে এই শহরের ১০ শতাংশ মানুষ জানে, তিনি সেই লক্ষ্মণরেখার আশেপাশে আছেন মাত্র। অতএব কর্পোরেশনের অধীনস্থ কলকাতার বাইরের ভারতবর্ষে পা ফেললে যে কালচারাল শকটা অবধারিত তা এই বয়েসে হজম করে নেওয়া মুশকিল, বাকিটা জীবন এখানে থাকাটাই শ্রেয় – এমনই স্থির করলেন।

কিন্তু তাও উনি ধূসর হরাইজনে ওই বিশতলা উঁচু ঝাপসা তারের দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে থাকেন আর ভাবেন যে ওপারে কিইবা থাকতে পারে। তার এতদিনের ক্যারিয়ারে কতগুলো লোককে যে ওই বর্ডারলাইন পেরোনোর আগে ধরে ফেলেছেন তার হিসেব-নিকেশ আর নেই। গ্যাস-মাস্ক পরিহিত অবস্থায় দিগন্তবিস্তৃত জলাজমিতে, নদীতে স্পিডবোটে, গড়িয়ার ধ্বংসস্তুপের অলিতেগলিতে তার সার্ভিস পিস্তল থেকে নির্গত বুলেট অন্তত পনেরোজনের বর্ডার পেরোনোর প্রচেষ্টা চিরতরে ব্যর্থ করেছে। কাজের ক্ষেত্রে তিনি নিয়ম ও অর্ডারকে প্রশ্ন করেননি কোন। পারমিট তিনি পাবেন না কেন? সমরেন্দ্র স্যান্যালের চাইতে ভালো কে বা আর জানে যে এই পারমিট যে সে পারমিট নয় – সে তো যে কোনো নাগরিকই যে কোনো সময়ে যে কোনো অছিলায় শহর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই বেরোনো মানে তো ফেরার রাস্তা বন্ধ চিরতরে। সমরেন্দ্র স্পেশাল পারমিট চান, অর্থাৎ যে পারমিটে বেরোলে ফিরেও আসা যায়, চাকরিও বজায় থাকে কলকাতায়। সেটা সবার জোটে না।

কেন ফেরার পথ খোলা রাখতে চান তিনি? স্ত্রী-পুত্র তো সেই তো কবে ফেরার পথ বন্ধ করা পারমিট নিয়ে চলে গেছেন, তিনি নিজে সই করেছিলেন কাগজে। কেন এমন পারমিট চান যাতে ফেরার পথটাও খোলা থাকে? সমরেন্দ্র বুঝলেন – তারিয়ে তারিয়ে বুঝলেন – যে একমাত্র স্পেশাল পারমিটই তার চাকরিজীবনের অর্জন হতে পারে বলে। এই একজীবন পুলিশগিরি করে কিছু তো একটা অর্জিত হবে যা শহরের ১০% মানুষ উপভোগ করে? এই যে এতগুলো প্রান তিনি নিলেন, এত রক্ত তার হাতে লেগে আছে – সেই ক্ষরণের বিনিময়ে কিছু তো পাওয়া যাক যা দূর্লভ?

চপারটা নেমেছে। এইবার ওটার পেট থেকে নেমে আসবেন ইন্টারপোলের একজন উচ্চপদস্থ আধিকারীক, ভারতীয় রাষ্ট্রের একজন সামরিক পদাধিকারী এবং কর্পোরেশনের একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অধিকর্তা। এরা সমরেন্দ্র স্যান্যালকে ডেকে পাঠিয়েছেন কোন এক গোপন মিশনে। ১০% এবার হাতের মুঠোর কাছাকাছি। সমরেন্দ্র স্যান্যাল এবার হেলিপ্যাডের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন।

section divider

২। সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী

গত রাতে পার্ক স্ট্রিটের পাবটিতে যখন প্রবেশ করছে আসাদ ইব্রাহিম তখন তার কব্জিতে দুটি ঘড়ির একটিতে মুহুর্মুহু বিপ হচ্ছে, একটা আলোর কাঁটা উত্তর-পশ্চিম দিকে উজ্জ্বল ইঙ্গিত দিয়ে তিরতির করে কাঁপছে, তলায় ল্যাটিচুড লঙ্গিচ্যুডের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব প্রায় মাতাল অথচ নিশ্চিত। আলো কম, গোলাপি আভা আর ধোঁয়ায় মোড়া জায়গাটা। একটা একশো বছর আগেকার রক গান – ডায়ার স্ট্রেইটসের ‘মানি ফর নাথিং’ – অপটুভাবে গাইছে কিছু ছেলে; এতটাই আদ্যিকেলে যে হাসি পেয়ে যায় আসাদের। ভিড় ঠেলে সে এগোয় উত্তর-পশ্চিম দিকে – তারপর থমকে দাঁড়ায় – ওই যে অদূরে বসে আছেন বছর পঁয়তাল্লিশ বয়েসের মহিলাটি। সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী, পদবী ব্যবহার করেন না। চামড়া ম্লান হয়ে আসছে, পোশাকের জেল্লার বয়সও বেশ পুরোনো – কিন্তু এখনও সুন্দরী, সেইরকম যার ফ্যাকাশে শ্রী দেখে আরো নবীন, সবুজ, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সময়ে কীরকম ছিল তা ভাবতে ইচ্ছে করে না।

আসাদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে সৃষ্টির দিকে, আর ওর মাথার মধ্যে স্ক্রোল ডাউন করতে থাকে ইতিহাস। সৃষ্টি ভিড়ের মধ্যে একাকীত্ম পেয়ে গেছেন, হাতের মৃদু কম্পন বলছে পানীয়র পাত্র তৃতীয় কিংবা চতুর্থ, কারণ সৃষ্টির স্নায়ুতন্ত্র ঝাঁঝরা প্রায়। এটা আসাদের অবজারভেশন নয়, তথ্য।

গান পালটে হয়ে গেছে অপটুভাবে গাওয়া পোলিসের ‘রোক্সান’। আসাদের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠলো – ‘পুট অন দ্য রেড লাইট’ – সৃষ্টি গানের দিকে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করছেন না। তার চাইতে বিশ বছরের কনিষ্ঠ শরীরগুলি আদ্যিকেলে ছন্দে উত্তেজিত হয়ে উঠলো; তার পা মৃদু তাল রাখছে কিন্তু খুব একটা উপভোগ করছে গানটা বলে মনে হয়না। সৃষ্টির দিকেও কেউ দৃষ্টিপাত করছেনা, তাই আসাদের এখন একমাত্র কাজ সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকা। আসাদ কব্জির ঘড়িটা খুলতে থাকে; একটা লহমা দরকার, একটা লহমায় সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী দেখবেন যে সুঠাম শরীরের একজন যুবক তার দিকে তাকিয়ে আছে, ঠায়। ২০৮২ সালেও যে তাকিয়ে থাকার বয়স কয়েক হাজার বছরের।

আসাদ কব্জির ঘড়িটা মুঠোর মধ্যে গুড়ো করতে থাকে, ভাঙতে থাকে জিনিসটা। যে লয়ে গানটা এগোচ্ছে তাতে শীঘ্রই শেষ হয়ে যাবে, আসাদের হিসেব বলছে এর পরের গানটি ধীরতর লয়ের হবে। তার আগে দৃষ্টিতে দৃষ্টিতে একবার মিলে গেলে আসাদ দৃষ্টি সরিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যাবে, তারপর গুড়ো হয়ে যাওয়া ঘড়িটার ওপর ঢেলে দেবে অ্যাসিড। সৃষ্টির মাথা বাঁদিকে হেলে গেল, আসাদ ওর দীর্ঘ গ্রীবা দেখতে লাগলো। গান অবধারিতভাবে ভাবে পাল্টালো ‘এভরি ব্রেথ ইউ টেক’-এ। আসাদের শরীর থেকে এবার নিয়ন্ত্রিত ফেরোমন বেরোতে থাকবে। তাতে কনিষ্ঠতর শরীর ও মনের অনভিপ্রেত ঝাঁকও আসবে, সেটা আসাদকে সামলাতে হবে। এই যৌনসম্ভাবনার ভিড়ে লক্ষ্যস্থির থাকতে হবে।

স্থির। সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে, যখন তার বয়স ছিল বারো পৃথিবীর কোন প্রান্তে তা আর মনে নেই, সেই সময়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে পড়ছে আসাদ ইব্রাহিমের। ম্যাসাচুসেট্‌স ইন্সটিটিউট অব টেকনলজিতে নিউরোসাইবারনেটিক্স বিভাগের একটি ঝকঝকে তরুনী। কলকাতায় তার কেউ থাকতোনা। সুন্দরী ঠিকই, কিন্তু তার চাইতে ঢেরগুন বেশি আকর্ষণ ছিল ক্যাম্পাসে তিনি বিদূষী বলে। অথচ ক্যাম্পাসে তো বিভিন্ন দেশের বিদূষী সুন্দরী কতই থাকে। সৃষ্টির মধ্যে তখন থেকেই সদ্যযৌবনা বুদ্ধিমতীর প্রগলভতা নেই; তিনি কথা বলেন কম, তিনি প্রায় ঈর্ষনীয় ঠান্ডা-মাথার বুদ্ধিমতী।

সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী এখনও কম কথা বলেন, এখনও তিনি বানের জলে নিজেকে ভাসিয়ে দেন না। দুইতিনজন নেশাগ্রস্থ যুবক-যুবতী তাকে নাচে আমন্ত্রণ জানালে তিনি এখনও প্রত্যাখ্যান করতে জানেন বিরাগভাজন না করে। সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী নাচতেন না, তিনি সবসময়েই ডান্স ফ্লোরের এক কোনায় বসে থেকে উপভোগ করতে জানতেন, জানতেন অনেক নৃত্যরত চোখ মাঝে মাঝেই তার দিকে ঘুরছে। এখন শুধু একজনের চোখ। কিন্তু মাঝবয়সে সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী সেই চোখকে এখনও আবিষ্কার করে উঠতে পারেননি।

“আই অ্যাম ওয়াচিং ইউ” – ঘড়িটার কাজ ফুরিয়েছে, এবার ঘড়িটাকে অ্যাসিড দিয়ে না গলিয়ে দিতে পারলে আসাদ ইব্রাহিমকে ট্র্যাক করে ফেলবে এই ঘড়িটারই ফ্রিকোয়েন্সি। একবার যদি দৃষ্টি বিনিময় হয় তাহলে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখা যাবে সৃষ্টিকে পাবে; কৌতুহল মানুষকে বসিয়ে রাখে। আসাদ ওয়াশরুমে উঠে চলে যাবে, ফের যখন ফিরে আসবে তখন সে দেখবে সৃষ্টির চোখ সেইদিকেই নিবদ্ধ, এবং কিছুটা চিন্তান্বিত। সেই দৃষ্টির সুতো গোটাতে গোটাতে আসাদ ইব্রাহিম তার দিকে এগিয়ে যাবে। তারপর সেই অমোঘ বাক্যটা বলবে যা সৃষ্টিকে দেবে দেজা ভ্যুর ঝটকা। আসাদ ইব্রাহিম এরপর আর সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীকে তার দৃষ্টি, শ্রবণ, ঘ্রানের বাইরে যেতে দেবেনা।

একজন তরুনীর ঘর্মাক্ত শরীর আসাদের উপর ঢলে পড়ল। মেথামফেটামাইন, মেয়েটি বেশ হাই হয়ে আছে। আসাদের মনে পড়ে গেল আঠারো বছর আগে একটা ঘর্মাক্ত শরীরকে। সেই শরীর যখন রতিচূড়ান্তে থরথর করে কাঁপছিল সেখানে আজকের আসাদ ইব্রাহিম ছিল না, পৃথিবীর কোন প্রান্তে যে ছিল তার মনে নেই। সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী – যিনি ডান্স ফ্লোরে কখনো নাচেননি – তার আকাঙ্খিত পুরুষকে সম্পূর্ণ পেয়ে যেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশিয়ে নিচ্ছেন তার অন্তরে আর আনন্দে আশ্লেষে তার শরীরে কম্পনের ঢল নেমেছে। ষোলো মিনিট আগে ধস নেমেছে আইএমএফের নেটওয়ার্কে; সেই ধসের যিনি রচয়িতা তার উরুর পেশিতে নামছে ধস, তিনি উরুসন্ধিতে গিলে নিচ্ছেন তার প্রৌঢ় প্রেমিককে। তারা তখন পলাতক, আন্ডারগ্রাউন্ডে। তাদের তখন খুঁজে চলেছে ইন্টারপোল।

“ক্যান। সামওয়ান। ট্র্যাক। ডাউন। দ্য বিগেস্ট। ট্রেমোর্স। হ্যাপেনিং। অ্যাট দিস মোমেন্ট। ইন আ উওম্যান? তাহলে ওরা আমাদের ধরে ফেলবে” – সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী বলেছিলেন, প্রতিটি শব্দের মাঝে নিঃশ্বাস নিতে নিতে। তার পুরুষ কিছু বলতে পারেননি।

আসাদের ইরেকশন হতে আরম্ভ করে আর সে মেথে হাই মেয়েটিকে এক ঝটকায় সরিয়ে দেয়।

মেয়েটি গালি দিতে শুরু করে, তার কয়েকজন বন্ধু তাকে সরিয়ে নিয়ে যায়। বেশ কয়েকজনের দৃষ্টি গোলাপী অন্ধকারে কয়েক লহমার জন্য এই রগড়ের দিকে ঘোরে।

লহমা। সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী এবার আসাদ ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়েছেন, আসাদের দৃষ্টি তার লক্ষ্যে স্থির। সে এগিয়ে যায়।

“লেডি, আপনার দৃষ্টি আমাকে বাইনারিতে টুকরো করছে – প্লিজ স্টপ কোলাপসিং মি” ।

সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী চমকে গেলেন। তার হাতের গ্লাস চলকে গেল। আসাদ ইব্রাহিম এবার আরেকটা ড্রিংক্স তৈরি করে দেওয়ার অজুহাত পেয়ে গেছে।

section divider

৩। আসাদ ইব্রাহিম

“আসাদ ইব্রাহিম – এই নামটা জানেন?”

জাপানি ও তাইওয়ানিজ নামের একটা সমাহার নিয়ে ইন্টারপোলের ইউরিকো হোয়াং সমরেন্দ্র স্যান্যালকে প্রশ্ন করলেন। মহিলার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, চোখের নিচে ভাঁজটা ছাড়া শরীরে কোথাও বয়সের লেশমাত্র নেই। পাশে একজন ভারতীয় পুরুষ – নরেন্দ্র সিঙ্ঘানিয়া – এবং আর একজন যিনি দেখতে ভারতীয় কিন্তু পদবীটা সমরেন্দ্রকে দিশেহারা করে দিচ্ছে – আদিত্য গোলস্‌বার্গ। তারাও তাকিয়ে আছে।

“না।” সমরেন্দ্র বললেন, যা বলা বাঞ্ছনীয়।

“রেডরাম রেনেগেড্‌স?”

“হ্যাঁ” – এইটা মিথ্যে বললে তার অ্যাকাউন্টেবিলিটি নিয়ে টানাটানি পড়বে। সমরেন্দ্র যে পদে আছেন তাতে বহির্বিশ্বের এই নামটার সাথে পরিচিত থাকাটা প্রয়োজনীয়।

“একটু বলুন এরা কারা” – সিঙ্ঘানিয়া জিগ্যেস করলেন।

“এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক হ্যাকার গোষ্ঠী, যাদের কার্যকলাপ আর শুধু ভাইরাস নির্মাণ এবং ডিসট্রিবিউশনে সীমাবদ্ধ নেই।”

“অতএব অন্যতম ডেঞ্জারাস এক্সট্রিমিস্ট গোষ্ঠীও বলা যায় কি? আপনার কাছে ওদের রিসেন্ট কার্যকলাপের কোনো তথ্য আছে?” – আদিত্য প্রশ্ন করলো।

“না। নেই” – সমরেন্দ্র এটা বলাই শ্রেয় মনে করলেন।

“আপনি মাওয়িস্ট বা আর্লি টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরির” – ইউরিকো এমনভাবে বললেন যেন সেই শতাব্দী পেরিয়ে গেছে – “ন্যাক্সালাইটদের সম্বন্ধে জানেন? ইন ইন্ডিয়ান কন্টেক্সট?”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমরা কলকাতার বাঙালি, আর্লি টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি ছাড়া আমাদের আছে কি?”

“সাউথ এশিয়ায় রেডরাম রেনেগেড্‌স প্রায় সমগোত্রীয় ধরতে পারেন – পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেলে বিপজ্জনকের মাত্রাটা আরো বিবর্তিত হয়ে যায়, ওরা বিবর্তিত মাওয়িস্ট্‌স বলতে পারেন।”

“বেশ। তার মানে রেডরাম রেনেগেড্‌স রেড লেভেলের বিপজ্জনক” – সমরেন্দ্র এই পর্যায়ের ইতি টানতে চাইলেন। তার মানে কলকাতায় কোনো টেরোরিস্ট অ্যাটাক হবে? ওনার অ্যাড্রেনালিন রাশ হল যেন, ১০% হাতের মুঠোয় এসে গেছে প্রায়। কিন্তু সেরকম পরিস্থিতিতে তো একঝাঁক মিলিটারির আগমন হওয়ার কথা, তিনজনের নয় তো?

“আসাদ ইব্রাহিম জন্মসূত্রে কাশ্মিরী। উনি এই সংগঠনের এই অঞ্চলের থিংক-ট্যাঙ্ক বলা যায়। ম্যাসাচুসেট্‌সে পড়াশোনা ও অধ্যাপনা করতেন। ওনার কার্যকলাপ ধরা পড়ার পর আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। গত দুই বছর উনি ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে ছিলেন”।

“আপনারা ধরতে পারেননি?”

“ভারতবর্ষ বিশাল দেশ মিস্টার স্যান্যাল।”

কর্পোরেশনের ব্যর্থতার দিকে আর কোন ইঙ্গিত নয়, সমরেন্দ্র স্থির করলেন।

“উনি মাস তিনেক হল মারা গেছেন – এই তথ্য কনফার্মড” – সিঙ্ঘানিয়ার এই নিরাবেগ উচ্চারণ সমরেন্দ্রর হিসেব গন্ডগোল করে দিল, তাহলে আসাদ ইব্রাহিম নয়, অন্য কেউ সেই চোর? ওনাকে যে চোর-পুলিস খেলতে হবে এই ব্যাপারে উনি নিশ্চিন্ত হয়ে গেছেন। তবে পরের কথাগুলোর জন্য উনি প্রস্তুত ছিলেন না।

“আপনি মাইন্ড ট্র্যান্সফারের কথা জানেন?”

“না তো – কি?”

আদিত্য গোলস্‌বার্গে বোধহয় কর্পোরেট মিটিং-এ সামারাইজেশন করতে ভালোবাসেন। তিনি বললেন – “মাইন্ড ট্রান্সফার এমন একটা প্রযুক্তি যার মাধ্যমে একজনের মন আরেকজনের মধ্যে ডেস্ট্রাকটিবল ট্রান্সফার করা যায়। ড্রেস্টাকটিবল – কারণ এতে ডোনার বডির – অর্থাৎ যার মধ্যে মাইন্ড ট্রান্সফার হচ্ছে, তার মন সম্পূর্ণ ইরেজ্‌ড হয়ে যায় এবং তিনি হয়ে যান অপর মনের অধিকারী। অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ এই প্রক্রিয়া এখনও সাধারণের আয়ত্ত্বে নেই বহির্বিশ্বে। প্রক্রিয়াটি আমাদের এক রাইভাল কর্পোরেশনের দ্বারা পেটেন্ডেড। মূলত যাতে উচ্চমানের রাজনীতিবিদ, বৈজ্ঞানিক, বুদ্ধিজীবিদের মনকে কার্যত অমরতা দেওয়া যায়, সেটাই এই প্রযুক্তির লক্ষ্য। গত দশ বছরে যত এস্পায়োনেজ, চোরাগোপ্তা কর্পোরেট যুদ্ধ হয়েছে তার অনেকটা এই প্রযুক্তি নিয়েই।”

“রেডরামের হাতে চলে গেছে এই প্রযুক্তি?” – সমরেন্দ্র তার ঝুলে যাওয়া চোয়াল কোনমতে নাড়িয়ে বললেন।

“সেটা আপনার না ভাবলেও চলবে” – আদিত্য বললেন – “আসাদের কোলন ক্যান্সার হয়েছিল। এবং যেহেতু তিনি আউটল তাই তার পক্ষে কোত্থাও এই ব্যাধির চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মৃত্যুর আগে তিনি একজন তরুণ, সুস্থতর মানুষের করোটিতে তার মাইন্ড ট্রান্সপ্লান্ট করে দিয়ে গেছেন।”

“প্রযুক্তি তাদের হাতে না গেলে এটা সম্ভব কি করে?”

“প্রযুক্তি বলতে আপনি যেটা বলছেন তার জন্য নিউরোসাইবারনেটিক্সের একটি হাসপাতালের ঘর লাগবে আর বাকিটা একটা বড়মাপের স্যুটকেসে এঁটে যাবে” – ইউরিকো হোয়াং বললেন – “আর এর পেছনে যে আমাদের রাইভাল কর্পোরেশনগুলির হাত নেই তা বলা যায় না”।

“কিন্তু রেডরাম কি তাদের অব্যাহতি দেয় নাকি?”

“একটা বাংলা প্রবাদ আছে ইন্সপেক্টর স্যান্যাল” – আদিত্য বললেন – “নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ।”

“বেশ।”

“এই যে ডোনার বডি – যার মাথায় এই মুহুর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক অ্যানার্কিস্ট মনটি নবজীবন পেয়েছে সে কলকাতায় ইনফিল্ট্রেট করেছে।”

“সে তো কারা গত তিন মাসে ঢুকেছে তাদের…।”

“অতটা সহজ নয়। ইনফিলট্রেট করেছে বললাম, পারমিট নিয়ে ঢোকেনি। আপনাদের রেকর্ডে যা তথ্য আছে তাতে কিছু হদিশ পাওয়া যাবেনা।”

“আমার কাজটা বুঝতে পারছি।”

“না – এখনও বোঝেননি” – ইউরিকো হাসছেন। তারপর কিছুক্ষণ বিহ্বল সমরেন্দ্রকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে তারা বুঝলেন যে ব্যাপারটা আদপেই উপভোগ্য নয়।

“উই নিড হিম অ্যালাইভ ইন্সপেক্টর” – আদিত্য নিজের করোটিতে টোকা দিয়ে বললেন – “দা মাইন্ড, ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? মুশকিল হল আসাদ ইব্রাহিম আমাদের খাতায় দীর্ঘদিনের ফেরারি। কিন্তু তার এই তরুণতর অবতার রেডরাম রেনেগেড্‌সদের চোখে এক মাসের ফেরারি।”

“অর্থাৎ?”

“অর্থাৎ তাদের সবচেয়ে বড় জীবিত থিংক-ট্যাঙ্কের মাইন্ড হাইজ্যাক করে যিনি পালিয়েছেন রেডরামের উপায় নেই তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া। এদের অনেক প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী আছে, আবার আমরাও আছি। কিন্তু স্টালিনের মন চুরি করে পালিয়ে গেলে কি আর সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে দিত?”

“আমি বুঝতে পারছি না” – সমরেন্দ্র বললেন – “আপনারা বলছেন যে ডোনার বডির মন সম্পূর্ণ মুছে যাবে। তাহলে সে তো এখন আসাদ ইব্রাহিম – সে কীভাবে বুঝবে যে এই মন চুরি করে পালাতে হবে?”

“সেটা আমাদের কাছেও স্পষ্ট নয় ইন্সপেক্টর। পৃথিবীতে যে পনেরোটা সফল এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে মাইন্ড ট্রান্সফারের তাতে ডোনার বডির ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ রিপ্লেসড হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সেই রিপ্লেসড প্রাক্তন মনের একটা ট্রেস থেকে যায় আনকন্সাস হিসেবে – অবচেতন হয়ে যায় আগের মনটি। আবার যার মাইন্ড অমরতা পাচ্ছে তার শুধুমাত্র কনসাস ট্রান্সফার্ড হয়, আনকন্সাস নয়। ট্রান্সফারের পর বিগত মানুষটিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়না, তাই মূলত যারা মূমুর্ষূ তারাই মাইন্ড ট্রান্সফার করান। আসাদ মারা গেছেন, কিন্তু আসাদের মাইন্ড যার শরীরে ট্রান্সফার্ড হয়েছে তাকে নিয়ে আমাদের তথ্য ন্যূণতম। সে কেমন দেখতে তাও আমরা জানিনা, আমাদের তথ্যে সে ভারতীয় এবং বাংলা ভাষা জানে। কেবলমাত্র রেনেগেড্‌সরা জানে সে কে। এবং – নাও দিজ কনসার্নস ইউ – এই শহরে তিনজন রেনেগেড অ্যাসাসিনেরও প্রবেশ ঘটেছে।”

“তারা আসাদ, বা আসাদের মন নিয়ে -”

“একজ্যাক্টলি। তারা এই মুহুর্তে সন্ধানরত, পেয়ে গেছে কিনা জানিনা। তাদের তিনদিন আগে এই শহরে প্রবেশ ঘটেছে আমরা জানি। এবার বলুন আপনার প্ল্যান অফ অ্যাকশন কি?”

সমরেন্দ্রর মগজ ছুটতে আরম্ভ করেছে – “আপনারা এই অ্যাসাসিনকে আইডেন্টিফাই করতে পারবেন? মানে – আমাকে তথ্য দিতে পারবেন?”

“তিনজনের মধ্যে দুইজনের।”

“বেশ। আমাদের আপাতত কাজ হল তাদের শনাক্ত করে চিহ্নিত করা।”

“এবং গ্রেফতার করা?”

“অ্যাট লিস্ট একজনকে লিকুইডেট করা। বাকি দুজনের মধ্যে প্যানিক হবে, অতএব তারা যদি ডিসকানেক্টেড থেকে অপারেট করে তবে তারা যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে বা একত্র হবে। দুজনকেই পাওয়া যাবে। তখন আমাদের কাজ তাদের কিচ্ছু না করে ট্রেস করে যাওয়া।”

“তারপর?”

“তারা যখন এই আসাদ বা হুএভারকে প্রায় ধরে ফেলেছে তখন অ্যাকশন নেওয়া অন স্পট।”

“এক্সিলেন্ট!” – ইউরিকো হোয়াং হাততালি দিয়ে উঠলেন – “এটা সম্ভব?”

“চান্স ফ্যাক্টরের উপর অনেকটাই নির্ভর করছে। আমার আপনাদের তথ্য, আপনাদের ট্রেসিং প্রযুক্তি এবং তা অপারেট করার মত স্পেশালিস্ট দরকার।”

“পেয়ে যাবেন।”

“আমি উঠছি – আমার সাব-অর্ডিনেটকে ডকুমেন্টস দিয়ে দিন। আমার লজিস্টিক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার আমি দেখছি, আপনাদেরটা আপনারা। বাকি কথা ফোনে হবে।”

সমরেন্দ্র জানালার কাঁচ দিয়ে এই আক্ষরিক অর্থেই কূপমন্ডুক শহরটার দিকে তাকালেন। ১০% নিশ্চিতভাবে তার হাতের মুঠোয় সার্ভিস আগ্নেয়াস্ত্রটির ঠান্ডা হাতলটার মত। তিনি হৃদয়কে ফুলপ্রুফ নির্মম করতে করতে দরজার দিকে এগোলেন।

section divider

৪। ফেরোমন

“তুমি কে? কি চাও?”

সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী তার স্যাঁতস্যাঁতে কিচেনের এক কোনায় একটা কিচেন নাইফ বাড়িয়ে রেখেছেন আসাদ ইব্রাহিমের দিকে।

আসাদ অন্ধকারে অন্ধকারের স্থাপত্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বেকবাগান অঞ্চলের আওয়াজ, সন্ধ্যেবেলায় বালক-বালিকাদের খেলার মাঝে চিৎকার এই ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে চুইয়ে চুইয়ে ঢুকছে। আকাশে উড়ন্ত বিজ্ঞাপন মাঝে মাঝে আলোকিত করে দিচ্ছে ঘর, সৃষ্টির শরীরে আলো পড়ছে না, আলো পড়ছে আসাদের শরীরে। তারপর আবার সে অন্ধকারে।

“কি চাও? দুদিন ধরে সিডিউস করেছ; এত কথা জানো কিভাবে আমাকে নিয়ে?”

“আপনি হাত থেকে ওইটা নামান। আমি কথা বলতে এসেছি, জানাবো বলে এসেছি।”

“শরীর চাও? এই শরীরে অবশিষ্ট যা আছে – চাও?”

“আমি শরীর চাইনা। আপনি ওই শরীরে আর বেশিদিন বাঁচবেন না। আমিও না। শান্ত হন – কথা শুনুন।”

“কিসের কথা? আমার ভয় লাগছে তোমার কথায়, স্মৃতি ফিরে আসাকে ভয় পাই আমি। আমি জীবনের শেষ বছরগুলো শান্তিতে মরতে পারবো না এতদিন সবকিছু সামলে নিয়ে? পুলিস ডাকবে তুমি?”

“আমি পুলিসের লোক নই। পুলিস পেলে আমাকেই নিয়ে যাবে – আপনাকে নয়। আমার হাতে সময় নেই – প্লিজ ওটা রাখুন – আমার কথা শুনুন। স্রেফ আপনার জন্যই আমি কলকাতায় ইনফিল্ট্রেট করেছি, সোজা পথে নয় – আমাকে পুলিস, ইন্টারপোল খুঁজছে – আর রেনেগেডসরা আমাকে পেলে মেরেই ফেলবে।”

“রেনেগেডস?”

“রেডরাম রেনেগেডস। আপনি যার ভিত তৈরি করে দিলেন, অথচ আপনাকে যারা ভুলে গেছে, জানে শুধু আপনার এলিয়াস। আপনাকে তারা চেনেনা, আমাকে ওরা খুঁজছে। ওদের বয়স অনেক কম, ওরা আপনাকে চেনেনা” – আসাদ সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীর হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে নামিয়ে রাখে মেঝেতে। তারপর তার কম্পমান শরীরটাকে মাটিতে বসায়; সেও বসে সামনে।

“তুমি তাহলে – এই বয়সে – কি করে চেনো আমাকে?”

“সে সব বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না। সে কথা থাক।”

“কি সে কথা থাক? তুমি এই দুই সন্ধ্যেয় আমার আয়ু কমিয়ে দিয়েছ! ভেবেছিলাম অনেক দিন পরে একজন পুরুষ আমার শরীর চায়; কিন্তু তুমি আমার স্মৃতি নিয়ে টানাটানি করছো!”

“শরীরই চাই। তবে ওভাবে নয়।”

“কিভাবে? নিয়ে বিদেয় হও!”

“আমার সময় নেই বেশি। আপনি এরকম হিস্টেরিকের মত করবেন না।”

“ব্লাডি ইউ নো এভরিথিং অ্যাবাউট মি! এভরিথিং আই কেপ্ট কনসিল্ড সো লং…। আমার কি নিজের বলে স্মৃতিটুকুও থাকবে না?”

“আমি আপনার সবকিছু জানি না। আপনি কলকাতায় আত্মগোপন করার পর কীভাবে ছিলেন জানিনা। স্রেফ তিনটে বছর জানি। তার আগের পঁচিশ বছর, তার পরের ষোল বছর – সে তো আপনারই রইলো!”

“ওই তিনটেই তো সব” – ঠিক দুই মিনিট পরে সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী কাঁদতে শুরু করলেন – “স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, দূঃস্বপ্ন – তোমরা – রেনেগেডরা – আমাকে কি ভাবো? হিরোইন?”

“ভালোই হত ভাবলে। আপনার মতন পায়োনিয়ার ইনসারজেন্ট কজনই বা আছে বলুন। কিন্তু আপনিও চাইলেন ইতিহাস থেকে মুছে যেতে, আপনাকেও ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া হল।”

“তাহলে – তুমি কি করে” – সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীর দৃষ্টি হঠাৎ জ্বলে উঠলো। তিনি এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে ছুরিটা খুঁজতে লাগলেন – “এনহান্সড ফেরোমোন! তুমি মাইন্ড কন্ট্রোল করছ শয়তান!”

“স্রেফ আপনাকে যাতে না হারাতে হয়! আমি আপনার মনের মধ্যে উঁকি মারিনি!” – পায়ের একটা জোরালো কিকে ছুরিটাকে আলমারির নিচে পাঠিয়ে দিল আসাদ, আর পেছন থেকে জাপটে ধরলো সৃষ্টির উত্তেজিত পলকা শরীরটাকে – “আমি অস্বীকার করছি না – আমার হাতে সময় নেই বিশ্বাস করুন!”

“তুমি কাদের তৈরি?” – সৃষ্টি আসাদের হাতের বেষ্টনিতে ঘুরে গিয়ে সোজা ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন – “তুমি এস্পায়োনেজে ছিলে – না? তুমি – তুমি বাচ্চাগুলোদের ফাঁদে ফেলো না গিয়ে! গিগোলো হও যাও! আমাকে কেন?”

“আমি কি ছিলাম আমার মনে নেই – ফেরোমন, হ্যাঁ – আপনাকে হারিয়ে ফেলতে চাইনি” – আসাদ সৃষ্টির দুইবাহু আঁকড়ে ধরে – “আপনি সিংক করছেন; শরীরের অবস্থা ভালো না।”

“আর ঠিক করা যাবেনা – চাইও না ঠিক হতে।”

“প্লিজ ডোনার নিন। সুস্থ শরীরে বাঁচুন!”

“কিসের ডোনার? কি ডোনার?” – এবার কথা জড়াতে লাগলো সৃষ্টির।

“আপনি বুঝবেন না। আপনি স্রেফ আমাকে সম্মতি দিন।”

“বাস্টার্ড! সিন্থেটিক ফেরোমনের ঝাঁঝে আমাকে – আচ্ছন্ন করে – সম্মতি চাইছো?” – সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীর শরীর ছেড়ে দিতে শুরু করে – “তোমার ফেরোমন প্রাকৃতিক নয়, সিন্থেটিক। তুমি নিজেকে মানুষ মনে করো? তুমি এনহান্সড কীট একটা, পতঙ্গ। তোমার ফেরোমন কৃত্রিম। তুমি একটা কৃত্রিম মিউটেটেড মানুষ যে পোকার মত নিজের অমানুষ গ্লান্ডস নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর তার ছিল কথার ফেরোমন, রেটরিকের ফেরোমন, স্বপ্ন দ্যাখানোর ফেরোমন, বিদ্রোহের ফেরোমন …।”

আসাদ ইব্রাহিমের কন্ঠ বাষ্পে আটকে যায়। সে জিগ্যেস করে – “কার?”

সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী সেই যুবকের বাহুতে জ্ঞান হারাতে হারাতে বলেন – “ওই বাস্টার্ডটার। আসাদ ইব্রাহিমের…।”

section divider

৫। ফেয়ার ট্রায়াল

মাথার পেছনে হাত তুললো আসাদ ইব্রাহিম। ফাঁকা হসপিটালের করিডোরে কুড়ি ফুট দূরে দুটি মৃতদেহ। আরো দূরে বিভিন্ন অবস্ট্যাকলের পিছনে পাঁচ জোড়া পিস্তল ওর দিকে তাক করা। ও নিজের পিস্তল সামনে ছুঁড়ে দিয়েছে।

“আসাদ ইব্রাহিম!” – সমরেন্দ্র স্যান্যালের কন্ঠ গর্জে উঠলো – “তোমার নিষ্কৃতির কোন উপায় নেই আর! আমরা ফেয়ার ট্রায়ালের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি! তুমি তোমার আইনজ্ঞ বেছে নিতে পারো যে কোন দেশের! পালাবার চেষ্টা করলে মরবে না, নিম্নাঙ্গ ঝাঁঝরা হয়ে যাবে!”

“আমি পালাবার চেষ্টা করছি না” – আসাদ বললো – “আমি শুধু আমার অপরাধ কি জানতে চাই।”

“ট্রিজন। স্যাবোটাজ। কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে নাশকতা। অন্তত দুটি টেরোরিস্ট অ্যাটাকের মাস্টারমাইন্ড তুমি যার ফলে অ্যাট লিস্ট তিরিশজনের মৃত্যু হয়েছে, বহুমূল্যের প্রপার্টি নষ্ট হয়েছে!”

“ডাজ দ্যাট বয়েল ডাউন টু আ ডেথ সেন্টেন্স?”

“না। লাইফ সেন্টেন্স – ইয়েস। আমরা ফেয়ার ট্রায়াল…।”

“অফিসার। আপনাদের প্রতিটা কথা রেকর্ডেড হয়ে লাইভ চ্যানেলে ব্রডকাস্ট হচ্ছে, আমরা আপনাদের চ্যানেল হ্যাক করেছি। দিজ প্লেস ইজ বাগ্‌ড!”

“হোয়াট দ্য হেল?” – বলে উঠলেন নরেন্দ্র সিঙ্ঘানিয়া।

“তাতে কি আসাদ? আমরা যা বলছি সজ্ঞানে বলছি।” – সমরেন্দ্র বললেন। তার আগ্নেয়াস্ত্রর লেজার আসাদের হাঁটুতে তিরতির করে কাঁপছে, তিনি এগোচ্ছেন।

“আপনি আমার যা যা অপরাধের খতিয়ান দিলেন তা অসম্পূর্ণ অফিসার। আপনার রেকর্ডস অসম্পূর্ণ।”

“উইল ইউ অ্যাডমিট ফার্দার ক্রাইম্‌স?”

“হ্যাঁ।”

“এক মিনিট – কর্পূর, রেকর্ডার অন করো! স্পিক, আসাদ ইব্রাহিম।”

“অফিসার – আমি শুধুমাত্র একজন সত্তর বছর বয়স্ক বৈজ্ঞানিক নই, আমি একজন বছর তিরিশের যুবকও বটে, যদিও আমার শরীরের বয়সটা আমি আর জানিনা একজ্যাক্টলি। তবে আপনাকে আমি বোধহয় বিনাঅস্ত্রেই ম্যানেজ করতে পারবো।”

প্রোভোকেশন ছাড়া তো গুলি করা যাবে না – সমরেন্দ্র ভাবছেন।

“২০৩ নম্বর ঘরে” – পিছনদিকে আঙুল দেখালো আসাদ – “একজন মহিলার মৃতদেহ আছে। সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী – ঝুলন প্রাইমারি স্কুলের অংক টিচার, বেকবাগানে থাকতেন, সিঙ্গল। তাকে স্ট্র্যাঙ্গেল করে হত্যা করা হয়েছে।”

“চেক করো!” সমরেন্দ্র চিৎকার করলেন। একজন সশস্ত্র পুলিস দৌড়ে চলে গেল ঘরটির দিকে। হসপিটালটি এখন আর তেমন চলেনা, কিন্তু এরা কীভাবে অনুপ্রবেশ এবং আয়ত্ত্ব করলো তার বিন্দুমাত্র হদিশ সমরেন্দ্রদের নেই। এখন যে দুজন রেনেগেড অ্যাসাসিন মৃত, তারা শুধুমাত্র তাদের ট্র্যাক করে এখানে হাজির হয়েছিলেন। তখন শুটআউট শুরু হয়ে গেছে প্রায় মিনিট পনেরো, হসপিটাল থেকে আতংকগ্রস্থ মানুষ পালিয়েছে স্রেফ যারা অসুস্থ তারা ছাড়া।

“ডেড বডি আছে স্যার! ফিমেল!”

“গলায় সবকটা আঙুলের ছাপ আমার। ঘরের সিসিটিভিতে কিচ্ছু পাবেন না। আমার কথা ছাড়া কোন এভিডেন্স নেই।”

কি চায় কি লোকটা?

“ভদ্রমহিলা ধর্ষিত। সিমেন টেস্ট করে আমারটা পাবেন। ধর্ষণ করা হয়েছে তার মৃত্যুর পর।”

সমরেন্দ্র ২০৩ নম্বর ঘরে উঁকি দিলেন। ধর্ষণের চিহ্ন এই দূরত্ব থেকেও বিদ্যমান কারণ মৃতার শরীরে একটা চাদর শুধু, সেটার তলার দিকটা তোলা – নিম্নাঙ্গ আলোয় উন্মুক্ত। অসম্ভব ঘৃণায় তার মাথাটা গুলিয়ে উঠতে শুরু করলো। যিনিই হন এই ভদ্রমহিলা, এই অপমান কেউ ডিজার্ভ করেনা। তার আগ্নেয়াস্ত্রর লেজার এবার আসাদ ইব্রাহিমের মাথার পেছনে কাঁপছে।

“আসাদ ইব্রাহিম। তুমি একজন পলিটিকাল এক্সট্রিমিস্ট! কিন্তু তুমি একজন বুদ্ধিজীবি ছিলে, একজন প্রজ্ঞাবান শিক্ষক, গবেষক!”

“আমি এখনও সেই মনের অধিকারী অফিসার। আসাদ ইব্রাহিম ছাড়া আমার কোন পরিচিতি নেই।”

“এই কাজ সেই ব্যক্তি করতে পারেনা!”

“একটা নতুন, সবল শরীর পেতে হয় স্রেফ। আর কিছু নতুন হরমোন।”

“তাহলে একটা লেফট র‍্যাডিকাল রাজনৈতিক দলের এই পরিচিতি তুমি দিতে চাও পৃথিবীকে?”

“এই পরিচিতি দিয়ে আমি নিজেকে সেই রাজনীতি থেকে বিচ্যূত করতে চাই” – আসাদ সমরেন্দ্রর দিকে মাথা ঘোরালো, তারপর নামিয়ে নিল কন্ঠস্বর – “সেটা আমার চাহিদা নয়, বাসনা বলা যায়, আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। এইমুহূর্তে আমি যা চাই তা মাইন্ড কন্ট্রোল করে পেয়ে যাবো অফিসার। সিন্থেটিক ফেরোমন, আমার শরীরের বোধ বলে আমি জেনেটিকালি কাস্টমাইজড মানুষ; আমার শরীর থেকে ফেরোমনের ক্ষরণ হয় যা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। ফেরোমন কিছু মাত্রায় মাইন্ড কন্ট্রোল করতে পারে। আমি জানি ২০৩০ সালে আটকে থাকা আপনারা বুঝতে পারছেন না জিনিসটা কি, আপনাদের পাঁচজনের যে কোনো একজন আমার শিকার হতে পারেন। বিশেষ করে ওইদিকে একজন মহিলা আছেন দেখতে পাচ্ছি – আমার লক্ষ্য এখন তার ঘৃণা।”

“তুমি কি চাও কি আসাদ ইব্রাহিম?” – সমরেন্দ্রর কন্ঠে ঘৃণা আর বিস্ময় যুগপৎ। ট্রিগারে তার আঙুল কাঁপছে।

“মৃত্যুদন্ড।”

section divider

৬। কেউ না

“আমার মেয়ে আমাকে আগের মত করে চিনতে পারবে না তো” – ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললেন প্রৌঢ়া।

তার সামনে বসা তিনজন যুবক-যুবতীর একজন আশ্বাস দেয় – “ফুফু কে বলেছে পারবেনা? ও জানবে আপনি আজীবন কি করেছেন ওর জন্য – কত কষ্ট করে মানুষ করেছেন।”

“মাকে ছোটবেলায় কেমন করে দেখতো মনে পড়বে?”

একজন যুবতী প্রসঙ্গ ঘোরায় – “ফুফু ওর মাথার মধ্যে যে মনটা আছে সেটা কত জ্ঞানী জানো? কত পড়াশোনা করেছে, কোথায় করেছে জানো? সেসব কি ও এই জীবনে পারতো? তুমি ওর কে কি সেটা চিনিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের তো – কাঁদে না ফুফু – আর এসব কথা যেন কেউ টের না পায়।”

এন্টালির বাড়িটির ছাদে তখন একজন যুবতী কানে হেডফোন লাগিয়ে কিছু একটা শুনছে। তার দৃষ্টি শহরের দিকে, তার মন অতীতচারী, তার মনযোগ তারে বয়ে আসা রেকর্ডেড কন্ঠে। আদ্যিকেলে এম্পিথ্রি প্লেয়ার, কারণ শব্দকে ব্লুটুথের মাধ্যমে হাওয়ায় তরঙ্গে ভাসানো যাবেনা। কয়েকদিনের মধ্যে ধ্বংস করে দিতে হবে অডিও ফাইলটা, নির্দেশ সেরকমই।

যুবতী শুনছে পুরুষের কন্ঠ, আর ওর শরীরের মধ্যে নতুন পাওয়া একটি চেতনা উদ্রেক করছে, নির্মাণ করছে কিছু জবাব। সেই জবাবের কোন কন্ঠস্বর নেই, অবয়ব নেই।

কন্ঠ আসাদ ইব্রাহিমের। জবাব সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনীর। এই দুটি নামই যুবতীর কাছে এতদিন অচেনা ছিল, সে তো এই শহরের কিশোরী ডেলিঙ্কুয়েন্টদের একজন।

কিন্তু এখন তো সে’ই সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী। তার বাইশ বছরের শরীরটা মাঝবয়েসী মনটাকে চিনতে শুরু করেছে, তার শরীরের মধ্যে সদ্য বাসা বাঁধা নতুন মনটাকে।

সৃষ্টি,

মাইন্ড ট্র্যান্সফারের প্রযুক্তি এখনও ত্রুটিহীন নয়। আমি জানি না আমি আগে কে ছিলাম, আমাকে জানানো হয়নি। আসাদ ইব্রাহিম যদি আমাকে বেছে নিতেন নিজে, যদি আমার সাক্ষাৎকার নিতেন, হয়তো তাহলে মনে থাকতো। কিন্তু তিনি তখন মৃত্যুশয্যায়। আমাকে বেছেছিলেন তার জুনিয়র কমরেডরা।

তাছাড়া আমার নিজের পূর্বপরিচিতি জানার ইচ্ছেও নেই।

মাইন্ড ট্রান্সফারের প্রযুক্তি ত্রুটিহীন নয় এখনও। আমাদের এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হয়েছে গোপনে, কর্পোরেশনের চোখের আড়ালে; ত্রুটি থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। আপনার ক্ষেত্রে হয়তো ত্রুটি আরো বেশি থাকবে।

আমি যখন আমার নতুন মন পেলাম, তখন আমি আসাদ ইব্রাহিম, কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে জেহাদের প্রথম সারির মেধা, যার তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের অন্তর্ঘাতের সময় হয়ে এসেছে সাইবারবিশ্ব থেকে মূর্তবিশ্বে নেমে আসার। আমার নতুন মন পাওয়ার পর আসাদ ইব্রাহিমের মেধা, জ্ঞান, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা সবকিছুই আমার দ্বিতীয় প্রকৃতি হয়ে গেছে, প্রথম প্রকৃতি যদি আমার শরীর হয়। আসাদের চাইতেও স্পষ্ট, কারণ আসাদের করোটিতে কোনো ন্যানোচিপ ছিলনা, আমার আছে। আসাদকেও যে স্মৃতি মন হাতড়ে খুঁজে নিয়ে আসতে হত আমার কাছে তা স্পষ্ট, আমি স্মৃতি খুঁজে পাই দ্রুত, রিপ্লে করতে পারি যতবার চাই। আমার মনের মধ্যে একটি ডেটাবেস, একটি স্মৃতির মিডিয়া প্লেয়ার আছে বলতে পারেন। আপনারও থাকবে।

আপনার কাছেও সব স্পষ্ট হয়ে যাবে, যা কিছু ধূসর হয়ে গেছে, যা কিছু ভুলতে চেয়েছেন এবং পেরেছেন সতেরো বছর ধরে। আসাদ ইব্রাহিম, রেডরাম রেনেগেড, কর্পোরেশন রাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, আপনার দ্রোহের যৌবন – সবকিছু। জানিনা, তা কতটা শুভ।

তবে একটা কথা জানাই আপনাকে। সবকিছু ডেটা, তথ্য হয়ে যাবে। সব আবেগ মুছে যাবে দেখবেন। মাইন্ড ট্রান্সফার এখনও আবেগ, অবচেতন, ইরর‍্যাশনালকে ট্র্যান্সফার করতে শেখেনি। আমাদের স্মৃতির সঙ্গে আমাদের আবেগের সম্পর্ক হয়ে যাবে নতুন।

আপনি আপনার আবেগ থেকে মুক্তি পাবেন।

আমি আসাদের আজীবন জানি, কিন্তু জানিনা তার আবেগ কেমন ছিল। তার যুক্তি আমার করায়ত্ত্বে, জানিনা তার মৃত্যুর সময়ের বোধগুলি। জানি না মৃত্যুর সময়ে তার আপনাকে নিয়ে কোনো অনুশোচনা ছিল কিনা।

আসাদ পন্ডিত ছিলেন, আমি এখন যতটা পন্ডিত। আসাদ আকর্ষনীয় ছিলেন, আমার মত শারিরীক আকর্ষণ নয়। বোধ করি তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মেধা তার অবয়বকে ভিন্ন সৌন্দর্য দিত, আমার অবয়বে তার সংশ্লেষ ভিন্নতর হয়তো। আমার শরীরে ট্যাটু আছে, আসাদের ছিল না। আমার যে জেনেটিকালি ডিজাইন্ড ফেরোমন, তাও আসাদের ছিল না। আমি যে কে ছিলাম, তাই তো জানিনা আমি। তবে রেডরাম রেনেগেডের কোন তরুণতর জেহাদি হয়তো, হয়তো আমি আসাদের ভক্ত ছিলাম, নয়তো নিজেকে এভাবে ডোনার কেন করে ফেললাম? নিশ্চয়ই আমার কমরেডরা কোন কারণে আমাকে যোগ্য ভেবেছিলেন আসাদ ইব্রাহিমের মননকে জীবিত রাখার কাজে।

আসাদ আকর্ষনীয় ছিলেন। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আকর্ষিত হত; আসাদের প্রেমিকা ছিলেন অনেকে। বিবাহে বিশ্বাস করতেন না তিনি, বহুগামী ছিলেন। তার জীবনে আসা প্রতিটি নারীকে আমি পুঙ্খানুপুঙ্খ চিনি, তার স্মৃতির মারফত। কিন্তু কেন তাহলে শুধুই আপনার স্মৃতিগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতাম?

আপনি – সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী – আমাদের মুভমেন্টের ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন। আইএমএফের ডেটাবেস ধুলোয় পরিণত হয়েছিল আপনার তৈরি করা ভাইরাসে। অথচ আপনার নাম কেউ জানেনা, জানে শুধু আপনার এলিয়াস – এরিয়াডনে।

আমাদের মুভমেন্টের ইতিহাসে কিংবদন্তী এরিয়াডনেকে আমি দেখলাম আসাদের চোখ দিয়ে – আসাদ যা দেখেছেন, আসাদ যা শুনেছেন, যেভাবে আসাদ আপনাকে স্পর্শ করেছেন, আসাদের যা ভাবনা আপনাকে নিয়ে – সব আমার নখদর্পনে। তার উপর ভিত্তি করেই বলছি, আসাদ আপনাকে ভালোবাসেননি যেভাবে আপনি আসাদকে ভালোবেসেছিলেন।

নতুন কথা কিছু বললাম না। আপনাদের সময়ের কজনই বা আর জীবিত আছেন? কজনই বা আর মুভমেন্টে আছেন? কজনই বা আর মনে রাখেন আপনার কথা? মনে রেখে বলবেনই বা কজন? বিপ্লবের প্রস্তুতিতে ভালোবাসা অকিঞ্চিতকর। বিপ্লবের জোয়ারে ব্যক্তিগত আবেগ খড়কুটো। আপনি – আমাদের ভিতের জননী স্রেফ সেকেলে আবেগের প্রতিভূ হয়ে থাকলেন আমাদের ইতিহাসে।

আপনার ভুল ছিল কি আপনার আবেগ? জানি না। আমার আবেগ কি ভুল? কে জানে! যে বিদূষী, স্থিতধী, সুন্দরী সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী আসাদ ইব্রাহিমের প্রেমে পড়েছিলেন তাকে আমি দেখেছি প্রথম পুরুষে। আমি যখন আসাদের স্মৃতি দেখি ফিরে ফিরে দেখি আপনি সেই প্রথম থেকে শেষ দিন অব্দি – যেদিন ক্যাঙারু কোর্টে আপনার দন্ড হল, স্থির হল আপনার সমস্ত পরিচিতি মুছে দিয়ে ইন্স্যুলেটেড কলকাতায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে যেখানে আজীবন বহির্বিশ্ব এবং মুভমেন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবেন আপনি – আপনি একই মুগ্ধতা নিয়ে আসাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন যখন আসাদ কথা বলতেন।

আসাদ বাগ্মী ছিলেন, ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী। মুগ্ধ তো হতেই হয়। কিন্তু আপনিই তো দেখছিলেন যে মানুষ হিসেবে আপনার মূল্য, আপনার চাহিদার মূল্য তার কাছে শুন্য হয়ে যাচ্ছিল – তাহলে আর মুগ্ধতা কেন? যখন আপনি ভঙ্গুর নিউরোটিক ধ্বংশাবশেষে পর্যবসিত হচ্ছেন তখন আপনি হয়ে গেলেন করুণার পাত্রী, বিদ্রোহের-বিপ্লবের সুদীর্ঘ কার্যক্রমে অক্ষম ও অনুপযুক্ত। আপনি তো আসাদের ত্রুটিগুলো দেখতে পাচ্ছিলেন – তাও কেন মুগ্ধতা থাকতো?

আসাদ একাধারে আপনার শিক্ষক, আপনার তাত্ত্বিক গুরু, আপনার রাজনীতির নেতা, আপনার বিদ্রোহের কান্ডারী – তাই বলেই তো? আসাদ সবসময়েই আপনার চাইতে উচ্চতর – তাই? আসাদ ইব্রাহিম প্রশ্নাতীত – তাই? কিন্তু এই পুরুষোত্তম কীভাবে অত্যন্ত কম বয়সে শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে যে সর্বোত্তম নারী – তার একটু একটু করে ভাঙতে থাকা দেখতে পেলেন না? বা দেখেও কিছু করলেন না? আপনি নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছিলেন প্রেমে, অথচ তার কোন মর্যাদা নেই। আপনার পরিচিতি পর্যবসিত হচ্ছিল শুধু মেলোড্রামাটিক প্রেমে, অথচ আপনি আমাদের প্রথম সারির অ্যাক্টিভিস্ট-তাত্ত্বিক, আপনি আপনার প্রেমিকা-সত্ত্বা থেকে পালাবার চেষ্টা করছেন, নিজের সত্ত্বা নিজের কাছেই লজ্জার হয়ে পড়ছে, অথচ আরো গভীরতর প্রেমে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছেন!

আপনার ‘অবসরপ্রাপ্তি’-র পর আসাদ আপনার খবর রাখতেন। কিন্তু আসাদ তো সবার খবর রাখতেন, তার স্মৃতি ঘেঁটে তো বুঝতে পারছিনা, তার চিন্তাপ্রণালীর বাহক হয়ে তো বুঝতে পারেছিনা সেই খবর রাখার মধ্যে অতিরিক্ত কিছু ছিল নাকি। তাহলেও বুঝতাম কিছু একটা মূল্য আছে।

আমি কে ছিলাম, কি ছিল আমার ব্যক্তিত্ব, আবেগের স্থাপত্য আমি জানি না – কিন্তু আসাদ ইব্রাহিমের স্মৃতি বারবার এপাশওপাশ করতে করতে আমিও আপনাকে মুগ্ধতা বিনা দেখতে পারিনা, আপনি যেমন মুগ্ধতা ছাড়া আসাদকে দেখতে পারেননি। এই মুগ্ধতার তো সর্বনাশ ছাড়া অন্য কোনো নিষ্পত্তি নেই! আপনার স্মৃতিই আমাকে কি এক ভিন্ন আত্মতা দিলো যে আমি ঠিক আসাদ ইব্রাহিমের নবজন্ম হয়ে উঠতে পারলাম না সৃষ্টি, আমার আপনার দুয়ারে সব খুইয়ে আসা ছাড়া কিইবা আর উপায় ছিল? আমি তো আসাদ হতে পারছি না! আমি তো আমিতেও ফিরে যেতে পারছিনা আর! এ কি শুধুই আমি তরুণতর শরীরের অধিকারী বলে?

আমি পালিয়েছি। হয়তো বিপ্লবের রণক্ষেত্র ছেড়ে পালানোটা সম্ভব আমি আসাদের মনের বাহক বলেই। আমার পিছনে রেডরামের ঘাতকরাও আসবেন। বিপ্লবী রাজনীতি এমনই ছিল সৃষ্টি, চিরকাল – আমরা নিজেদেরকেই সন্দেহ করি বেশি, আমাদের সুপারইগো নেতৃত্বের সঙ্গে মতের অমিল হলে প্রথমে আমরা নিজেদের নামে মারি, মানে মারি, তারপর জানে মারতেও হাত কাঁপে না, আমাদের মধ্যে নেতৃত্বলিখিত নিয়মই সর্বেসর্বা, প্রশ্নাতীত। বিপ্লব আসছে – এই অজুহাতে দলের মধ্যে স্বৈরতন্ত্র চালু করতে আমাদের হৃদয় কাঁপে না। তাই আমি যেহেতু ফেরারি, মৃত্যু বিনা আমার নিষ্পত্তি নেই।

কিন্তু আমি তো আসাদ ইব্রাহিমের বুদ্ধির বাহকও! তাই, কিছু একটা তো করতে হয়…।

আপনি আমার সামনে শুয়ে আছেন এখন। যে কোন মুহুর্তে ঘাতকদের আবির্ভাব হবে, তার আগে এই রেকর্ডিং হাতবদল হয়ে যাবে। কলকাতায় আমাদের কমরেড সেইসব যাবতীয় সরঞ্জাম উধাও করে দিয়েছে যাতে প্রমাণিত হতে পারে যে আপনার মাইন্ড ট্রান্সফার হয়েছে। আপনার মারণ রোগাক্রান্ত শরীর এখন মনশুন্য, আপনার মন তরুণতর একটি শরীরে ইমপ্লান্টেড হয়েছে।

ফারহা এহসান খুব ভালো মেয়ে সৃষ্টি, সে আপনার জ্ঞান, মেধা, বুদ্ধিকে জীবিত রাখবে, হয়ে উঠবে বিপ্লবের নতুন দিশারী। শুধু আপনার আর আমার সমান্তরাল আবেগের বর্জ্য পদার্থের উত্তরাধিকারী কেউ থাকবে না।

কি দরকার?

কর্পোরেশন এবং পুঁজিবাদ যে প্রযুক্তিতে তাদের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠতর মানুষদের অমরতা নিশ্চিত করছে সেই উদ্দেশ্যে সেই প্রযুক্তি কেন ব্যবহার করবে এক বামপন্থী বিপ্লবী গোষ্ঠী? কি প্রয়োজন আসাদ ইব্রাহিমের মগজ বাঁচিয়ে রাখার? যে মুভমেন্ট পিতৃটোটেমের অমরতার উপর নির্ভরশীল সেই মুভমেন্টকে মুছে দিয়ে শুন্য থেকে শুরু করা উচিত।

আমি আপনার সাথে যা করেছি তা ধর্ষণই, ফেরোমন ব্যবহার করে আপনার মন নিয়ন্ত্রণ; আমি আপনার সাথে যা করবো এখন তা আরো গর্হিত, আপনাকে আমার মৃত্যুদন্ডের অজুহাত করছি, নাকি চরিতার্থ করতে চলেছি আমার কাম? জানি না, আমি উদ্ধার হতে চাইনা। আমি আসাদ ইব্রাহিমকে কলঙ্কিত করতে চাই; তার ওপর ঈর্ষান্বিত হয়েই হয়তো, বা হয়তো এইজন্যই যে আমি তো রেডরাম রেনেগেডসদের কাউকে বোঝাতে পারবো না কখনো যে আপনার সঙ্গে যা করেছিল আসাদ তা অক্ষমনীয়।

আমার কৈশোরোচিত আবেগই হয়তো এই নীতিবোধের কারণ। আমি আসাদ ইব্রাহিম হতে পারিনি, আপনার স্মৃতি হতে দেয়নি।

তবে একটা গ্রহণযোগ্য কারণও আছে – আমি চাইনা আপনার মনের তরুণতর বাহকের আমার প্রতি কোন শ্রদ্ধা থাকুক – আমি চাই সে ঘৃণা করতে শিখুক আমাকে। ব্যক্তি আর ভাবনা আলাদা, আসাদ ইব্রাহিমের ভাবনার জয় হবেই। ব্যক্তির কোন ভবিষ্যৎ না থাকলেও হয়।

আমি আপনাকে ভালোবেসেছিলাম সৃষ্টি প্রিয়দর্শিনী।

ইতি

কেউ না।

divider

Featured Image by Shenjuti Dutta

I will request readers not to republish this work of fiction without attribution, or adapt it into any other derivative form for commercial purpose without the permission of the writer.
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.

mini_Aparthibo 30 May 2a Reduced

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s