রিখি এবং লিঙ্গোপেনের অপার্থিব সঙ্গীত

ইনস্যুলেটেড কলকাতার মধ্যশহরে – অর্থাৎ সল্ট লেক সিটির দ্বিতীয় উচ্চতম অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর চোদ্দতলার নির্বাসনে – হ্যাকার সুহৃদ মন্ডল বুঝতে পারছেনা সে তারকাখচিত অন্ধকার শহরের দিকে তাকিয়ে আছে না তার ল্যাপটপের হলোগ্রাফিক আয়তক্ষেত্রের দিকে। সে তো আর কয়েকদিনের জন্য হ্যাকার।
আর এই কয়েক দিনের মধ্যেই তাকে বস্তার নিয়ে উপন্যাসটিও লিখে ফেলতে হবে। কারণ যতদিন হ্যাকার থাকতে পারবে সে, ঔপন্যাসিক হওয়ার সম্ভাবনাও ততদিনের। শুধু সে বুঝতে পারছেনা তার বস্তার নিয়ে উপন্যাসটা হিস্টোরিকাল ফ্যান্টাসি হবে না কল্পবিজ্ঞান।
সে আর কয়েকদিনের জন্যই হ্যাকার – কারণ সুহৃদ বুঝেছে যে তার বুকের পাটা ফুরিয়েছে। তার একটা পা জন্মের কয়েক মাস পর থেকেই দূর্বল, তার পক্ষে এই শহরকে বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন ও ইনস্যুলেটেড করে রেখেছে যে কয়েক মাইলের সুরক্ষিত জলাভূমি আর তারপর যে বিশতলা উঁচু তারের দেওয়াল, তা পেরোনো কোনদিনই সম্ভব নয়।

দারিয়াস মজুমদার পেরেছিল, সে পারবে না। দারিয়াস আর তার হ্যাকিং-এর শিক্ষা শুরু হয় এই শহরেই, দুজনেই ছিল তুখোড়, দারিয়াস পালাতে পেরেছে, সে পারবে না। দারিয়াসের সম্পদ ছিল তার স্বাস্থ্য, পৌরুষ এবং সাহস। তার কোনোটাই নেই সুহৃদের। সেই পনেরো বছর আগে যখন দারিয়াস শহর ছেড়ে পালালো, ওকেও ডেকেছিল। সুহৃদ মন্ডল শেষ মুহূর্তে বলেছিল যে তার দ্বারা হবেনা। দারিয়াস চলে যাওয়ার আগে দৃষ্টি দিয়ে ভর্ৎসনা করেছিল, তারপর বলেছিল – “তোর মত হ্যাক করতে আমি পারবো না; এলিয়াসটা পাল্টাস না। অন্তত কোড পড়ে যেন চিনতে পারি ওটা তুই”।
পেট্রোক্লাস – সুহৃদ এলিয়াস পালটে ফেলেছিল সেই রাত্রেই।
সেই হ্যাকিং-এর বুকের পাটাও আর নেই সুহৃদের। ট্রোজানের যুদ্ধে – যবেই হোক না কেন – তার অন্তত কোনো ভূমিকা থাকবে না। এই যে এখন একটি দূর্বল পা নিয়ে সে বসে দেখছে কলকাতার ২০৭০, যা আসলে ২০৩০, যা চিরকালই ২০৩০-এই আটকে থাকবে – এর থেকে তার নিস্তার আর নেই।
নিস্তার নেই বদ্ধ স্থান ও কাল থেকে, নিস্তার নেই প্রিয়াম কর্পোরেশনের চক্রব্যূহ থেকে। অভিমন্যূ সুহৃদ প্রবেশ করতেই শিখেছিল শুধু। কাঁচের দেওয়াল দিয়ে প্রিয়ামের অন্তত তিনরকম দানবিক লোগো সে দেখতে পাচ্ছে, হেসে ফেললো সুহৃদ – চক্রব্যূহ তো অন্তত ভেদ করেছিল সে! কোডের মারপ্যাঁচে তো আর নিস্তার পাওয়া যায় না ব্যূহে প্রবেশ করার পর।
এখন যে ঠুনকো নিরাপত্তায় আছে সে তাই বা চুরমার হয়ে যেতে কতক্ষণ? অ্যাপার্টমেন্টটি তার দাদার, কড়া নির্দেশ আছে দরজার বাইরে পা না রাখার। দাদা ঘুষের শেষ সম্ভাবনা অব্দি ছাড়ছে না, দূর্নীতির সমস্ত ফাঁকফোকর খুঁজে নিচ্ছে সে, প্রতিপত্তির কোনো পাথর না উলটে রাখছে না ভাইকে বাঁচাতে।
“তুই হ্যাক করেছিস, অস্বীকার করে লাভ নেই, জেরার মুখে স্বীকার করবি। কেন করেছিস? সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস লেখার জন্য, জুভেনাইল ব্যাপারস্যাপার হয়ে গেছে, স্বীকার করবি – বাকিটা আমি দেখছি”।
উপন্যাস। তারপর সেই মিথ্যেটা ভালো লাগতে আরম্ভ করলো সুহৃদের। হ্যাঁ, সে উপন্যাসই লিখতে চায় – ঐতিহাসিক উপন্যাস। আবার – এখন – তার চোখের সামনে আলোকিত আয়তক্ষেত্রে একটা ওয়ার্ড প্রসেসিং প্রোগ্রাম খোলা, তাতে যেটা লেখা হচ্ছে সেটা উপন্যাসই। কিন্তু তার পাশে যে টার্মিনালটি খোলা সেটা প্রিয়াম কর্পোরেশনের ক্লাসিফায়েড তথ্যের – বস্তার নিয়ে।
বস্তার নিয়ে ঐতিহাসিক ছাড়া কি উপন্যাসই বা হবে? তিন বছর হয়ে গেল – বস্তার তো নেই। ২০৬৭-র ২৫শে জুন, বস্তার ভারতবর্ষের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

divider
সল্ট লেকের চোদ্দতলার অনেক নিচে আর বেশ কিছুটা দূরে, যেখানে কলকাতার দক্ষিণ-পশ্চিম কোনটি শেষ হওয়ার মুখে – সাদার্ন এভিন্যিউয়ে – লেকের দিকে হাঁটছিল ফিলোমেলা হেমব্রম, সঙ্গে তার পাঁচ বছরের কন্যা। ঢাকুরিয়া লেক এবং তার চারপাশেই, কি এক অদ্ভূত খেয়ালে, প্রকৃতি এখনও খানিকটা বেঁচে আছে কলকাতায়। লেক, তারপর রেললাইন, তারপর সাউথ সিটির ধ্বংসাবশেষ, তারপর কলকাতা ঘেরা নো-ম্যানস বেল্ট শুরু। সাদার্ন এভিন্যিউ দিয়েও রক্ষীদের আনাগোনা চলে – কিন্তু ধরপাকড়, কড়াকড়ি এখানে তেমন নেই। নেহাতই ছাড় দেওয়া আছে। অঞ্চলজোড়া নিম্নমধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তদের বসতি, শহরের প্রান্তরে যেমন থাকে আরকি – তাও রাতভোরের দিকে লেকের জল, ঘাস, গাছ মানুষের কোলাহল থেকে মুক্ত থাকে। গত চারঘন্টা হল রাস্তার তলা থেকে রাত্রিকালীন গ্যাস বেরোচ্ছে, মাইলের পর মাইল মানুষ ঢলে পড়েছে ঘুমে। লেকে ঘুমিয়ে পড়েছে নেশাগ্রস্থরা, রমণের মাঝপথে আলিঙ্গনাবদ্ধ মানুষ, পাগল।
রিখি মায়ের হাত ছাড়িয়ে দৌড়োলো। ফিলোমেলা দৃষ্টির ব্রাইটনেস বাড়িয়ে মেয়ের দিকে খেয়াল রাখে; তারপর জলের ধারে বসে জলকে একটু স্পর্শ করে। ফিলোমেলা জানে রিখি কোথায় যাবে, এক সপ্তাহ আগে একটা চারাগাছ পুঁতেছে একটা বড় গাছের তলায় – সেখানে।
রিখির ইচ্ছে ছিল গাছটা টবে পোষে, বাড়িতে। কিন্তু সাততলা বাড়িতে তিরিশটা পরিবারের ভিড়ে নিরাপদে টব রাখার জায়গা কোথায়? সবেধন বলতে তো দেড়খানা ঘর – আর জানালাও নেই একটাও নিজস্ব। গাছ আলো পাবে কোথায়?
“কিন্তু মা তুমি যে বলো আমরা এখান থেকে চলে যাবো?”
যাবে কোথায় কেউ জানে না, কিন্তু এই ভিড়ে থাকাও দুর্বিষহ। চলে গেলে টবে গাছ নিয়ে যাওয়া হবে – মেয়েকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। তারপর ফিলোমেলা ভাবে যে এত মানুষ, এত গরীব-গুরোবের ভিড়ে কি যেন এক নিরাপত্তাও আছে। যাওয়ার কারণ থাকলেও যাওয়াকে ঠেকিয়ে রাখা যায় আরো কিছু মাস অন্তত।
কারণ কেউ জিগ্যেস করেনা যে শহর যখন ঘুমে ঢলে পড়ে মাঝরাতের গ্যাসে, যে ঘুম ভাঙার পর বিমূঢ়, হতভম্ব অবস্থায় স্তম্ভিত হয়ে থাকে মানুষ, গত রাতের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায় – ফিলোমেলার বা রিখির উপর কেন তার কোনো প্রভাব পড়েনা। সে জন্যই যে তারা আর পাঁচটা মানুষের মত নয় – সাদার্ন এভিন্যিউয়ের বস্তিগুলোয় বেচারা মানুষগুলোর এই প্রশ্নও জাগেনি গত একবছর। তারা এই বাচ্চা মেয়েটাকে আর তার বাচ্চা মাটাকে ভালোবেসে, আদরে-যত্নে ঘিরে রেখেছে। এ জন্যেই এই অঞ্চল ছেড়ে যাওয়া যায়না।
বোধহয় তারা জানেও না যে কর্পোরেশনের রাত্রিকালীন গ্যাসের প্রভাব এই মা আর তার মেয়ের উপর পড়েনা। ফিলোমেলা আর রিখির সামনে কতবার ঘুমে ঢলে পড়েছে মানুষ – তারা জানতেও পারেনা যে দুজন কখনো ঘুমিয়ে পড়েনা। পরদিন ঘুম ভাঙার পর তাদের মনেও পড়বে না যে কাল রাতে তাদের ঘুমন্ত চোখের সামনে জেগে ছিল – ফিলোমেলা আর রিখি।
এই যেমন এখন ঘাসের উপর নগ্ন নিম্নাঙ্গ নিয়ে দুজন পুরুষ ঘুমন্ত – ফিলোমেলা দ্যাখে – কাল সকালে মনেও করতে পারবেনা ওরা যে ওদের আলাপ হয়েছিল আজ রাতে, আলাপমাত্র আশ্লিষ্ট হয়েছিল কামনায়।
এরা জানেনা যে ফিলোমেলা হেমব্রম দুইতিন কিলোমিটার দূরে টহলরত সৈনিকের, আগমনরত ড্রোনের রেডিও সিগনাল ধরে ফেলে, অতঃপর কমিয়ে দিতে পারে শরীরের তাপমাত্রা। রিখিকে এতদিনে শিখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ঘুমের ভড়ং করতে হবে যেখানে আছে সেখানেই টহল কাছাকাছি আসামাত্র, আবার উঠে পড়া যাবে টহল চলে গেলে – রিখি এটাকে মজার লুকোচুরি খেলা হিসেবেই শিখে ফেলেছে।
লুকোচুরি। ফিলোমেলা হেমব্রমের কাছে এটা খেলা নয়, অস্তিত্ত্বের একটি অবধারিত স্ট্র্যাটেজির নাম। রিখি এখন লুকোচুরিকে উপভোগ করতে থাকুক, কারণ একটা সময় আসবে যখন রিখিকে মাতৃপরিচয় লুকিয়ে রাখতে শিখতে হবে।

divider
২০৬৭-র ২৫শে মে, বস্তার ভারতবর্ষের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যেদিন সারাবিশ্ব তোলপাড় হয়েছিল ডুমস্‌ডের ভীতিতে – কারণ কমেট এলেনিন ২-এর সেদিন প্রায় পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করে ফেলার কথা। সেইদিন, সারা গোলার্ধময় প্রাকৃতিক তোলপাড়, ভূমিকম্প আর সুনামির পর দেখা গেল বিশেষ ক্ষতি হয়নি গ্রহের। এলেনিন ২ চলে গিয়েছিল, কিন্তু বস্তার থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল সমস্ত আদিবাসী।
ঠিক দশ বছর আগেই যখন বস্তার আর ভারতীয় রাষ্ট্রের সংঘাত তুঙ্গে, তখন রাষ্ট্রের সাথে কর্পোরেশনের চুক্তি হয় যে এই অঞ্চলের উপর আর ভারতীয় রাষ্ট্র কোনরকম মালিকানা রাখছে না। ভারতবর্ষে আটটি কর্পোরেশন এতদিন শুধুমাত্র মেট্রোপলিসগুলোই কিনে নিচ্ছিলো – বস্তার ভারতবর্ষের প্রথম নন-মেট্রোপলিটান অঞ্চল যা কর্পোরেশনের শাসনের আয়ত্ত্বাধীন হয়। ’৫৭-র ডিসেম্বরে অঞ্চলের আদিবাসী মানুষরা দেখছিলেন যে মিলিটারি, আধা-মিলিটারি সমস্ত সৈন্য বস্তার ছেড়ে চলে যাচ্ছে, হুররা-পিঞ্জোরি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে – হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন তারা। তাদের শতাধিক বছরের অভিজ্ঞতা বলছিল এ কোন ঐতিহাসিক ক্ষণ নয়, ক্ষমতার হাতবদল হচ্ছে।
আর ঠিক দুইসপ্তাহের মধ্যেই কর্পোরেশনের প্রবেশ ঘটে বস্তারে। কর্পোরেশন, অর্থাৎ আবার সৈন্য, আবার জান্তব বিজাতীয় মেশিন খনি ও বনসম্পদ লুঠ করার জন্য। শুধু এইবার মানুষজন একটু আলাদা – পোশাক ভিন্ন, অনেক লোকই দিশি, কিন্তু অনেক অনেক বিদেশি সৈনিক। অনেক সৈনিক আবার মানুষই না – আধা-মানুষ, আধা-মেশিন। আদিবাসীরা বুঝলেন যে একটি ভিন্ন পর্যায়ের রক্তক্ষরণ এবার শুরু হবে। কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল যে নির্মমতায় এই আধা-মেশিনগুলি দিশিগুলির চাইতে কম নয়, বরং বেশি। তাদের হত্যা করা কঠিন, শারিরীক যন্ত্রণার কোনো বোধ তাদের নেই। শুধু ওরা রেপ করতে পারেনা, সেগুলি পুরামানুষগুলোই চালিয়ে গেল অতঃপর।
সামরিক প্রযুক্তির এই উন্নততর ভবিষ্যত আর বিশেষ কিছু ফারাক আনতে পারেনি বস্তারে। কিন্তু কর্পোরেশনও ঠাওর করতে পারেনা যে জান্তব উল্কা আকাশ ফুড়ে চলে গেলে কেন একটা অঞ্চলের সব মানুষ বেমালুম উধাও হয়ে যায়।
২০৬৭-র ২৫শে মে আকাশ ভেঙে প্রলয় নেমেছিল। ডুম্‌সডের ভীতি দিশি-বিদেশি সব মানুষের মধ্যেই প্রভাব ফেলে। গত এক সপ্তাহ ধরে সৈনিক, কর্মী, আধিকারিক সব পালিয়েছে, কড়া শাস্তির হুমকিও কাজ দেয়নি। কর্পোরেশনের উচ্চপদস্থরা বলেছিলেন যে প্যানিক মাত্র কয়েকদিনের, ২৫শে মে কোনোমতে পেরিয়ে যেতে দেওয়াই ভালো। ফলে প্রলয়ের প্রাক্কালে বস্তার প্রায় সামরিক পুরামানুষশুন্য হয়ে গিয়েছিল বলা যায়, আর আধামানুষগুলোকে আপাতত নিষ্ক্রিয় থাকতে বলা হয়েছিল। বস্তারের আকাশে শুধু বেড়ে গিয়েছিল ড্রোনের আনাগোনা।
কিন্তু প্রলয়ের ঝড়ে ড্রোন, স্যাটেলাইট, নেটওয়ার্ক সব বেসামাল। আর বিশ্বজুড়ে প্যানিকের সময়ে স্রেফ বস্তার তখন প্রায়োরিটিতে পড়েনা। ভিয়েতনামের স্পেস স্টেশনে সেইদিনই একটি ব্যাখ্যাহীন বিস্ফোরণ ঘটে। ২৫শে মের প্রাক্কালে সামান্য যা সংযোগ ছিল বস্তারের সঙ্গে কর্পোরেশনের তাতে যা জানা গিয়েছিল তা কিঞ্চিত মাত্র ছিল চিত্তাকর্ষক কর্পোরেশনের কাছে। সেমারগাঁও-য়ে নাকি বিস্তীর্ন এলাকার সমস্ত আদিবাসী একত্র হচ্ছে, তাদের কূলদেবতা লিঙ্গোপেনের মন্দিরের আশেপাশে। এটাও ট্রাইবালদের প্যানিকের অভিব্যক্তি হিসেবেই ধরলেন কর্পোরেশনদের কর্তাব্যক্তিরা। সভ্য বিশ্বে যা হচ্ছে তার তুলনায় এ কিছুই না – ‘কিপ ইওর ওয়াচ বাট ডোন্ট ইন্টারভেন’ – কমান্ডার বলেছিলেন।
শুধু এলেনিন ২ পৃথিবী তোলপাড় করে চলে যাওয়ার পর – এবং ক্ষয়ক্ষতি ও অ্যাপোক্যালিপ্সের নাটক নেহাতই মামুলি এই নিশ্চিন্তির পর একটি বিচিত্র বার্তা আসে কর্পোরেশনের সদরে।
বস্তার জনশুন্য হয়ে গেছে – এই তল্লাটে আছে শুধু জন্তু – একটিও – ‘রিপিট, নট এ সিঙ্গল হিউম্যান এক্সিসটেন্স ইজ ট্রেসেবল’ – মানুষ নেই।

divider
২০৬৭-র ২৫শে মে ফিলোমেলা বুঝেছিল যে তার কন্যাসন্তানটি নেহাতই সাধারণ মানুষ নয়। এলেনিন ২-এর আগমন অদ্ভুত অভিঘাত ফেলেছিল শিশু রিখির মধ্যে – সে নাকি ঝড়বৃষ্টির গর্জনের মধ্যে শুনতে পাচ্ছিল অপার্থিব সুর, সেই সুর গেয়েও শোনাচ্ছিল গুনগুন করে। তার মেয়ে ততদিনে আধো আধো হলেও ভাষা ব্যবহার করতে পারতো। সেই সুর আর বর্ণনা শুনে চমকে যায় ফিলোমেলা। তারপর কয়েক মাস ধরে নজর রাখে মেয়ের বেড়ে ওঠার উপর।
ফিলোমেলা হেমব্রম’ও সাধারণ মানুষ নয় – সে অ্যান্ড্রয়েড – সে ফেরারী অ্যান্ড্রয়েড। হেমব্রম তার বেছে নেওয়া পদবী। এই শহরে প্রবেশ করার মুখে পুছতাছের সময়ে পদবীটা আচমকা বেছে নিয়েছিল সে। সে কৃষ্ণাঙ্গিনী, তার শরীর ছিপছিপে বেতের মত সুঠাম – অতএব যখন সে বলেছিল যে সে রাওঘাট থেকে পালিয়ে এসেছে – বিশ্বাসযোগ্য হয়েছিল। রেটিনার ইম্প্রিন্ট নেওয়ার সময়ে সে দৃষ্টি এমনভাবে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল যাতে সিস-বায়োলজিকাল মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব না হয় যে সে অ্যান্ড্রয়েড, ল্যাবরেটরিতে তৈরি উন্নত পর্যায়ের ডিজাইনার মানুষ। তারপর সমস্ত প্রোটোকল শেষ হলে যখন সে আরো অনেক শরণার্থির সাথে বাসে উঠছে তখন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল, আঁকড়ে রেখেছিল কন্যাকে। তখন আর পাঁচটা শরণার্থির মতো দুদন্ড তারও মনে হয়েছিল যে এই শহরে আসা মানে পৃথিবী থেকে চিরবিচ্ছিন্ন হওয়া ঠিকই, কিন্তু থাকা-পরা-খাওয়াটা তো নিশ্চিন্তির হবে। শুধু যেহেতু সে ফিলোমেলা – থার্ড জেনারেশন অ্যান্ড্রয়েড – এবং যেহেতু সে এখন ফিলোমেলা হেমব্রম – যেটা সে করবেনা আর সেটা হল সামাজিক উত্থানের চেষ্টা। যত উর্ধ্বে ওঠা, তত ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
ফিলোমেলা জানে তার আয়ু আর বড়জোর পাঁচ বছর। তার জেনেটিক ডিজাইনে একটা সামান্য খুঁত তাকে তার যমজ বোন ইকিরার থেকে স্বল্পায়ু করে দিয়েছে। ইকিরার যা যা ক্ষমতা, সব তার আছে, শুধু ধীরে ধীরে তার ইমিউনিটি কমতে থাকবে যা ইকিরার কমবেনা কোনদিনও।
সেই যখন তাদের বয়স পাঁচ, তখন দুজনেরই তুখোড় মগজ, কল্পনাতীত শারিরীক ক্ষমতার যাচাই হল। ইকিরাকে কর্পোরেশন নিয়ে গেল কোথাও, আর ফিলোমেলাকে পাঠানো হল ভারতবর্ষে। ব্যাঙ্গালোরের জেনেটিক সেন্টারে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হল কর্পোরেশন যে ফিলোমেলার জেনেটিক ত্রুটি আছে, পঁচিশের বেশি সে বাঁচবে না। তখন ওর বয়স বারো, ও পালিয়েছিল। ওর শারিরীক ধাঁচ নিগ্রয়েড হওয়ায় মধ্যভারতবর্ষে মিশে যাওয়া সহজ হয়েছিল।
আবার সেখান থেকেও পালাতে হয় যখন আবির্ভাব হয়েছিল কর্পোরেশনের, এক বছরের মাথায়। কিন্তু অরণ্যের কি এক টান যে বস্তারে ফিলোমেলা গোপনে ফিরেছে বারবার এবং পালিয়েছেও গেরিলার মত। সেখানকার মানুষজনের হয়তো মনে ছিল – তাদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার সময় অব্দি – যে একটি মেয়ে ছিল যাকে বারংবার ধর্ষণের চেষ্টা ব্যর্থ হত, এবং তারপরেই উধাও হতে হত তাকে।
খালি হাতে যে পাঁচজন সৈনিককে পৌরুষ এবং জাহান্নমের অপারে পাঠিয়ে দিতে পারে একটি কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরী, সে খবরটা সদরে পাঠানোর জন্যেও কেউ বেঁচে থাকতো না। আর তুমুল আক্রমণ নেমে আসতে পারে জেনেও ভারি আহ্লাদে আদিবাসীরা মাওয়িস্ট হানার ফিকটিশাস সাক্ষ্যপ্রমাণ রচনা করতো (আর দায়িত্ব নিতো ফিলোমেলাকে এলাকা থেকে পগার পার করার)। কর্পোরেশন একটি অস্বাভাবিক ক্ষিপ্র এবং দুর্দান্ত মেয়ের খবর পায়নি কোনোদিনও। কিছু করার থাকতো না ফিলোমেলার – ডিফেন্স তার রিফ্লেক্স – আর নিজের পরিচয় গোপন রাখার ব্যাপারে সে অসহায়, তাকে ধরে ফেলতে গেলে মরতে হবেই।
একদিন ফিলোমেলা জেনেছিল যে সে সত্যিই অসহায় – কারণ সে বিজ্ঞানের এমন বিস্ময় যার হদিশ বিজ্ঞান এখনও পায়নি। এখন অব্দি কোন অ্যান্ড্রয়েড নারীর পক্ষেই – পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটিই তো আছে – সন্তানধারণ করা সম্ভব হয়নি। হয়তো ইকিরা কোনোদিন সন্তানসম্ভবা হয়ে গেলে আবার তার যমজ বোনের সন্ধানে গ্রহ চষে ফেলবে কর্পোরেশন। কিন্তু সে তো সেই কোনকালেই নিজের শরীর থেকে ট্র্যাকিং চিপস বের করে ফেলেছে! তাও রিখির আগমনে তার মনে হল যে এবার কর্পোরেশন তাকে ধরে ফেলবে, তাকে আর তার মেয়েকে।
তারপর সে টের পেয়েছিল – তখন রিখির বয়স দুই – যে রিখি মানবসভ্যতার প্রথম সন্তান যার মধ্যে অ্যান্ড্রয়েডের চূড়ান্ত সম্ভাবনাগুলি আছে প্রাকৃতিকভাবে। অর্থাৎ যে অতিমানবীয় বৈশিষ্ঠ্য ইকিরা আর ফিলোমেলার আছে কারণ তাদের জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ল্যাবরেটরিতে, সেই গুণাবলীগুলোই রিখির রয়েছে সে ফিলোমেলার গর্ভে লালিত হয়েছে বলে।
তখনই ফিলোমেলা ঠিক করে যে বিচ্ছিন্ন, ইনস্যুলেটেড কলকাতাতেই লুকিয়ে থাকতে হবে, এটাই সবচাইতে নিরাপদ স্থান কারণ এই শহর সেই ২০৩০ সাল থেকে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানে সাধারণ মানুষ তাকে চিনতে পারবেনা, আর সে সাধারণত্বের উর্ধ্বে উঠবেনা – অন্তত আরো বারো বছর।

divider
সুহৃদের চোখের সামনে দুটি নথি – একটি স্ক্যান করা কাগজের ফাইল (ও নিশ্চিত যে এর এনক্রিপশন ভেদ করা শুধুমাত্র দারিয়াস মজুমদারের মানের হ্যাকারের পক্ষেই সম্ভব, কিন্তু ও ওর প্রাক্তন এলিয়াস ব্যবহার করেনি তাও) আর কর্পোরেশনের ক্লাসিফায়েড রেকর্ডস।
স্ক্যান করা ফাইলটি তাদের পূর্বপুরুষের একটি ডায়রি। সনাতন মন্ডল ১৯৬০-এর দশকে দন্ডকারণ্য প্রোজেক্টের অন্তর্গত হয়ে বস্তারের কোয়েলিবেড়া অঞ্চলে যান; তারপর ১৯৭৭-র পর মরিচঝাঁপিতে ফিরে আসেন। কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতা বাকিটা জীবন ধরে একটি ডায়রিতে লিখেছিলেন উনি। এই ডায়রিই ছিল পঙ্গু সুহৃদের বাল্যকালের সঙ্গী, এই ডায়রিতেই ও প্রথম জানতে পারে বস্তারের কথা। আর মরিচঝাঁপির।
৩০শে মে ২০৬৭-র মধ্যে কর্পোরেশন বুঝে গেছে যে বস্তারে সত্যিই কোন মানুষ নেই আর। ড্রোন, স্যাটেলাইট, তাপচিত্র, শব্দচিত্র, গত দেড়শো বছরের প্রযুক্তির সব মারকাটারি যন্ত্র একটি আদিবাসী মানুষেরও চলন বা শ্বাসের প্রমাণ রাখতে পারেনি। কেউ নেই।
আর এই ব্যাখ্যাহীনতার সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ব্যাখ্যাহীন, এবং সেটিই কর্পোরেশনের কাছে সবচেয়ে অ্যালার্মিং প্রমাণিত হয়েছিল। দান্তেওয়াড়ার কাছাকাছি যে বক্সাইট খনিটি – বৈলাডিলা বা মোষকুঁজ পাহাড়ে (বৈলর অর্থাৎ মোষের ডিলা বা কুঁজ) – কর্পোরেশনের স্থাপত্য, যন্ত্র, মানুষ, যন্ত্রমানুষ তছনছ হয়ে ধ্বংস তো হয়েছেই, তার সাথে খনিটির জায়গায় এখন বিদ্যমান পৃথিবীর গভীরতম গহ্বর, একটি ক্রেটার। একমাত্র মাঝারি সাইজের উল্কা পড়লে যা হতে পারে। উল্কাবৃষ্টি ২৫ তারিখ পৃথিবী জুড়েই হয়েছে, কিন্তু এখানেও যে হয়েছে তার প্রমাণ নেই।
এই ধ্বংসস্তুপ প্রিয়াম কর্পোরেশনের কাছে স্যাবোটাজের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে গন্য হল তৎক্ষণাত। কিন্তু ট্রাইবালদের দ্বারা এটা কি করে সম্ভব? মানুষ মারা তেমন কিছু না হলেও – এত দানবাকৃতির মেশিন, অন্তত পঞ্চাশজন সাইবর্গ সৈন্যকে এভাবে খোলামকুচির মত ছুঁড়ে ফেলে তছনছ করে দেওয়ার জন্য তো অত্যাধুনিক একটি ছোটখাটো আর্মি প্রয়োজন আর অনেক বিস্ফোরক? এই স্যাবোটাজ ট্রাইবালদের দ্বারা নয়, একমাত্র রাইভাল কর্পোরেশনগুলির দ্বারাই সম্ভব। কিন্তু তারা তো স্থলপথে বস্তার পৌঁছোতে পারবে না, আবার আকাশপথে যে আক্রমণ হয়েছে তার প্রমাণও তো নেই।
কলকাতা এসব কিছু জানে না। ইনকর্পোরেশনের সময়ে চুক্তিই হয়েছিল যে ২০৩০ সালের পর কলকাতার বেশিরভাগ মানুষ বাইরের পৃথিবীর কোন খবর পাবেনা, রাখবে না, বিনিময়ে পাবে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসার নিশ্চিন্তি। এই নিশ্চিন্তিই বেছে নিয়েছিল কলকাতা, এই নিশ্চিন্দিপুরে বস্তারের আরণ্যকের খবর পৌঁছোয়নি পাঁচ বছরেও। কেবল আন্ডারগ্রাউন্ডের অ্যানার্কিস্টরা জানে। তা’ও সুহৃদ যতটা জেনে ফেলেছে তার তিরিশ শতাংশ’ও না।
সুহৃদ জানে যে এরপর বস্তারে উড়ে আসতে থাকে আরো উন্নত আপগ্রেডেড সাইবর্গ-সৈন্য – তীক্ষ্ম স্নায়ু আর ধাতব পেশির পাহাড়, যাদের চোখে যন্ত্রের দৃষ্টি, যাদের কানে মানুষের পক্ষে শোনা অসম্ভব এমন শব্দেরও হদিশ পৌঁছোয়, যাদের ঘ্রাণশক্তি কুকুরের মত, যাদের মনুষ্যত্ত্ব তলানিতে ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে – তারা তন্নতন্ন করে বস্তারের অরণ্যে খুঁজেছে মানুষ।
পায়নি। কিন্তু সেটা ক্লাসিফায়েড রিপোর্টের লাল দাগ দেওয়া তথ্য নয় – তথ্য হল এই যে সেই সাইবর্গগুলি, এবং তাদের মানুষ সহচরগুলি তো বটেই – জঙ্গলে এক এক করে মরতে আরম্ভ করে অজানা অপঘাতে। বস্তারে অন্তর্ঘাত বস্তারের আদিবাসীদের অনুপস্থিতিতেও জারি ছিল। অরণ্য তখন ব্যাখ্যাহীন আতংকের অন্ধকার হয়ে গেছে সৈনিকদের কাছে, যা হওয়ার কথা। হ্যাঁ, সেই আধামেশিনগুলিও হয়তো – সেই কিশোরবয়সে ল্যাবরেটরি থেকে কাস্টমাইজেশন (এদের ভাষায় ‘কস্মেটাইজেশন’) সম্পূর্ণ হওয়ার পর – এই প্রথম একটি ফেলে আসা আবেগের সম্মুখীন হয়েছে – বিভ্রমের এবং আতংকের। তাদের মননে শৈশবের ভীতি ফিরে আসতে থাকে বহুদিনের অবদমনের পর, যা তাদের ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে প্রায় অসম্ভবের সামিল। পুরামানুষের মত উন্মাদ হয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয় আর, কিন্তু তাদের গ্র্যানাইটের মত মুখে যে আতংকের পরত, তা কর্পোরেশনকে দুশ্চিন্তিত করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ – কারণ সৈনিকগুলি আর যুদ্ধক্ষম থাকছে না। যুদ্ধ হচ্ছে না কোথাও, কিন্তু তারা মরছে।
এই জাগতিক চেকমেট ছয়মাস ব্যাপী চলার পর কর্পোরেশন ঠিক করে যে বস্তারে থাকাটা আর প্রোডাক্টিভ হচ্ছেনা, আর কর্তারা প্রায় দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। এখনও খনিজ ও বনসম্পদে বস্তার লোভনীয়, এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়াটা হঠকারীতা – বিরুদ্ধমত উঠে আসে। ভারতীয় রাষ্ট্র বস্তারে পোড়া হাত ফেরাবে না, এই জায়গাটাকে রাইভাল কর্পোরেশনের হাতে বিনিপয়সায় এভাবে তুলে দেওয়ারও কোন মানে হয়না। এই টানাপোড়েন চলে আরো বছর দেড়েক – যার পর সত্যিই অংক প্রমাণ করে যে বস্তারে কর্পোরেশনের উপস্থিতি লাভের চাইতে ক্ষতি করছে বেশি।
তারপর এক রাত – যখন বস্তার থেকে ধীরে অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষেই মত জোরদার হচ্ছে সদরে – তখন ডেপুটি কমান্ডার জোসেফ র‍্যান্ডাল মিটিং ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে বোধহয় সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে যান। একা একটি স্টেলদ বম্বার নিয়ে উড়ে যান বস্তারের নৈশআকাশে, নিক্ষেপ করেন মাইলের পর মাইল ন্যাপাম। আগুনের লেলিহান শিখা টেনে নেয় – এরও ব্যাখ্যা সহজ নয় – ওনার বিমানটিকেও। কেউই জানতে পারবেনা যে মৃত্যুর সময়ে র‍্যান্ডাল হ্যালুসিনেট করেছিলেন – আগুনের শিখায় যেন নাচছে আগুনের হলকায় তৈরি এক অপার্থিব অবয়ব!
সেই পোড়া বনভূমি চিরতরে পোড়েনি, অরণ্য কখনো চিরতরের জন্য পোড়েনা, কিন্তু এরপরেও বস্তারে রহস্যের উদ্রেক থামেনি – কর্পোরেশনও অতএব অরণ্য ছেড়ে যেতে চেয়েও পারেনি।
বস্তারের মনুষ্যহীনতায় অন্তর্ঘাত থমকে গিয়েছিল মাসখানেকের জন্য – কিন্তু আবার শুরু হয়েছিল ধীরলয়ে – সেই কয়েক মাসে পোড়া অরণ্যে যে পোড়া গাছগাছালি পাওয়া গিয়েছিল তাতে জীববৈজ্ঞানিকরা পেয়েছিলেন অজানা ক্রোমোজম।

divider
রাতের আকাশের তলায়, ঢাকুরিয়া লেকের ঘাসে গা এলায় ফিলোমেলা হেমব্রম – ওই দূরে রিখি সেই চারাগাছটার সাথে কথা বলছে (গাছটা নাকি মনে মনে ওর সাথে কথা বলে; ফিলোমেলা মেয়েকে অবিশ্বাস করেনা)। তারপর সেও মনে মনে মেয়ের জন্য লিঙ্গোপেনের রূপকথা বাঁধতে থাকে, বস্তারে শোনা গল্প –
কুয়াশাঢাকা কোন গণনার অতীতে, থাকত সাত ভাই। সাত ভাই বড় হতে থাকল সেই গাঁয়ের বনে ঢাকা শান্ত ছায়ায়। বড় ছয় ভাই ছিলো দামাল দুরন্ত অরণ্যসন্তান। তারপর এদের ছোটো ভাই লিঙ্গো-ডোকরা এবং এদের এক বোন কোহলা কাসসো। ছোটো ভাইটি ধির-স্থির, শান্ত-শিষ্ট, জ্ঞানগম্ভীর। তার গভীর কাজলচোখে ছায়া পড়ে অরণ্যের, আকাশের ও মননের আয়নায় ফুটে ওঠে প্রজ্ঞাঋদ্ধ তারারাজি। আর তার রক্তে রক্তে বইতো গানের তরঙ্গলহরী বুঝি। এক সাথে বারো রকমের বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারত সে। বনের গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড়েরাও বুঝি শান্ত হয়ে শুনতো সেই বাজনা, ভেসে যেতো সুরের প্রবাহে।
বাকি ছয়ভাই খেত-খামারের কাজ করতে লাগল দিনভর, বয়ঃক্রমে ঘর বাঁধলো, বিয়ে করল। পড়ে রইলো লিঙ্গো। অথচ তার গান-বাজনায় এতই মুগ্ধ ছিলো তার দাদাবৌদিরা, যে তাকে ঘরের কাজ, বনের ফল-কাঠ-বীজ-শিকার জোগাড়, খেতি-বাড়ির কাজ, এমনকি রান্না-বান্নার কাজ করার জন্য বকুনি দিতে মন সইতো না কারুরই। সে এ’সবের ধার ধারতো না, শুধুই গাইতো আর বাজাতো। ক্রমে ক্রমে তিক্ত হয়ে উঠলো তার ছয় দাদার গৃহী মন। অনেক চেষ্টা-চরিত্র করেও তারা পারল না লিঙ্গোর গানবাজনা বন্ধ করে তার মন সংসারে ফেরাতে। তাই গোপনে তাকে হত্যা করার ফন্দি আটল। লিঙ্গোকে শিকার করা শেখাতে নিয়ে চলল তারা গভীর জঙ্গলের ভিতর। জঙ্গলের ভিতর ছিল এক শালপ্রাংশু বীজা গাছ। সেই গাছটা দেখিয়ে তারা লিঙ্গোকে বলল –“ওই দ্যাখ, ওটার কোটরে তক্ষক লুকিয়ে আছে, উঠে গিয়ে ছুরি দিয়ে মার ব্যাটাকে, তোর বৌদিরা আচ্ছাসে ঝোল রেঁধে খাওয়াবে”।
তক্ষক মারতে লিঙ্গো উঠে পড়ল সেই বীজা-গাছে, আর কোটরে কোটরে, ডালে-ডালে খুঁজতে লাগল তক্ষককে। ইতিমধ্যে ছয় ভাই তীর ধনুক তাক করে ঘিরে ফেলল গাছটাকে। ধনুকের ছিলা টেনে মারল এক তীর ভাইকে লক্ষ করে সটান! অথচ তীর গিয়ে লাগলো বীজা-গাছের ডালে। সেই গাছের আঠা হয় লাল রঙের। টুপটুপ করে গাছের লাল রস নীচে পড়তে দেখে দাদারা ভাবল – “লক্ষ্যভেদ করেছি বটে!”
ভাইকে রেখে ছয় দাদা পত্রপাঠ চোঁ-চাঁ দে-দৌড় গ্রামের বাড়ির দিকে। বাড়ি পৌঁছে হাঁপ ছাড়লো – ‘যাক! বাঁচা গেলো! আপদ বিদেয় হয়েছে!’ তারপর বৌদের সামনে নাকিকান্না জুড়লো – ‘অমন সোনার ভাইটা আমাদের গো! কোন জন্তু এসে নিয়ে গেলো গো!’
এদিকে বীজা গাছ তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কোনো তক্ষকের দেখা মিলল না। সে একমনে শিকার খুঁজছিলো, আর তিরটাও দাদারা ছুঁড়েছিলো তার আগোচরেই। হঠাৎ লিঙ্গো দেখতে পেলো, অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে; চারিদিক শুনশান, দাদাদের দেখা নেই, সাড়া নেই। অবাক হল সে। তড়তড় করে গাছ থেকে নেমেএসে মেঠপথে হাঁটা দিলো বাড়ির দিকে। কাছাকাছি এসে শোনে ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল।
পা টিপে টিপে খিড়কি দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলো সে। নিঃসাড়ে কান পেতে শুনলো সব কথা, বুঝলো কারসাজি। রাগে দুঃখে বুঁজে এসেছে তার গলা। টুঁ শব্দটি করল না তবু। মাথা ঠাণ্ডা রাখলো। চুপচাপ নিজের ঘরে এসে বসে থাকল সে। সহসা তাকে দেখতে পেয়ে চমকে উঠলো তার দাদাবৌদিরা। একঘর বাকরুদ্ধ ফ্যাল-ফ্যাল চোখের সামনে নির্বিকার লিঙ্গো তান দিতে লাগল তার বাদ্যযন্ত্রে, সুরের ঢেউ ছুটে চলল অন্ধকার বনের বুকে ঢেউ তুলে যে’মত সেই।
দিন যায়, রাত যায়। ক্রমে লিঙ্গোর বিয়ে ঠিক হল এক ‘সিরহা’ বা তন্ত্রমন্ত্র জানা ম্যাজিক-হীলার তথা শামান পরিবারে। তার বউও জানত জাদুটোনার নানান উপায়-পন্থা, নানান বীজমন্ত্র। ঘরে মন টেঁকে না নতুন দম্পতির। রোজ দাদাদের গঞ্জনা, দৈনন্দিনের কলুর ঘানি – তাতে কি আর সহজে মন টেঁকে সেই ভাবুক বাজনাদার বা তার যাদুকরী বউয়ের? দাদাদেরও কি আর তার অকর্মণ্য ভাইয়ের প্রতি খুনী রাগ সহজে মেটে? একদিন দাদারা মিলে বলেই বসল –
‘তোমাদের আর পুষতে পারবো না আমরা। তোমাদের জন্য সবার অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। তোমরা বাপু এই গ্রাম এই পরগনা ছেড়ে পাড়ি দাও ভিনমুলুকে। বিষয়সম্পত্তির বাটোয়ারা পাবে না, আগেই বলে রাখলাম। এই একটা চুম্বকের লকেট দিচ্ছি পরিবারের স্মৃতি হিসেবে। ব্যাস, আমাদের আর দায়দায়িত্ব খতম, নিজেদেরটা নিজে বুঝে নাও গে’
সেই চুম্বক সম্বল করে পায়ে হেঁটে পাড়ি দিলো বর-বৌ। ক্রমে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে, পরগণার সীমানা ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল তারা বনের ভিতর দিয়ে। পথ যেন ফুরোতে চায় না। খিদে, তেষ্টায় জুড়িয়ে আসে শরীর, চলতে চায় না পা। তবুও, গাছের ফল-মূল খেয়ে, খড়কী নদীর, মেণ্ডকী নদীর জল, চাররে মাররে জলপ্রপাত ও অন্যান্য বুনো ঝোড়া ও কাঁদরের জল খেয়ে কোনো রকমে ভুখ-পিপাসা মেটাতে থাকলো তারা। অবশেষে একটা শিমুলগাছের ছায়ায় ঢাকা গ্রামে এসে পৌঁছোলো তারা। দেখলো, একটা গোলায় পড়ে আছে অজস্র ধানের শীষ – ঢেঁকিতে ঝাড়াই-মাড়াই করে অনেক আগেই চাল নিয়ে নেওয়া হয়েছে সেই সব শীষ থেকে।
সেই দেখে তারা সিদ্ধান্ত করল যে সেই শূন্য শীষ বা পোয়াল থেকেই ভিজিয়ে ভিজিয়ে কিছুটা হলেও চাল বের করে নিতে পারবে তারা। যে চাষীঘরের গোলায় তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই চাষীকে গিয়ে বলল তাদের দুঃখের কাহিনী। সেই দুঃখ উথলে উঠলে শিমুলগাঁয়ের সেই চাষীর মন। বলল – ‘তোমরা ঐ পোয়ালগুলো ভিজিয়ে নাও, যা চাল বেরোবে, সব তোমাদের’।
এই শুনে বরবৌ করল কি – সেই গ্রামের মাঠিতে বসালো তাদের সেই চুম্বক-লকেট। রেখে বলল – ‘তুমি আমাদের একমাত্র অবশিষ্ট কূলচিহ্ন। যদি এই পোয়াল ভিজিয়ে পর্যাপ্ত চাল বের করতে পারি আমরা, তাহলে তোমাকে মানব, তোমার প্রতিষ্ঠা করব কূলদেবতা হিসেবে। নৈলে তোমার উপর হেগে মুতে ছুঁড়ে ফেলে দেবো তোমাকে!’
এমন বলে ভেজাতে লাগল সেই শুকনো পোয়ালগুলো। ততক্ষণে সেইখানে জড়ো হয়ে গেছে গ্রামের বেশ কিছু কৌতূহলি মানুষ। সবার বিস্ফারিত চোখের সামনে – পোয়াল থেকে চাল বের হতে লাগল। এত চাল এত চাল যে এক পাত্রে কুলোয় না। আরও বড়ো পাত্র আনা হল। তাও পড়ল উপচে! গাঁয়ের লোকে বলল – ‘চমৎকার! চমৎকার! অদ্ভূত ক্ষমতাধারী এক দম্পতি এসেছে আমাদের মধ্যে’
সেইদিন ধূমধাম করে সেই শুকনো পোয়াল থেকে বেরোনো চাল থেকে ভরপেট খেলো গ্রামবাসী। শিমুল-গাঁ, মানে গোঁড়ভাষায় যা হল ‘সেমারগাঁও’ – সেইখানেই প্রতিষ্ঠা হল সেই চুম্বক-লকেট – লিঙ্গোর কূল-কৌলক টোটেম। যুগ-যুগান্ত ধরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে, গোণ্ড আদিবাসীদের ভক্তির আদর পেয়ে, সেই টোটেম হয়ে উঠেছে সমস্ত গোণ্ড আদিবাসীদের আদি-পিতার চিহ্ন।
এদিকে তার দাদাদের কানে পৌঁছোলো এই সব কাহিনী। ঈর্ষা পরিণত হল দ্বেষে, চাগিয়ে উঠলো সেই পুরোনো ভ্রাতৃঘাতী ইচ্ছাটা। ধেয়ে এলো তারা লিঙ্গোকে মারতে। বারোটা গাড়িতে বলদ জুতিয়ে তারা সংগ্রাহ করল ঢালাও জ্বালানী কাঠ। অগ্নিসংযোগ করল তাতে। ইচ্ছা, ভাইকে ধরে বেঁধে এনে সেই আগুনে ফেলে পুড়িয়ে মারা। দেখতে দেখতে ধকধক করে বনের মাথা ছাপিয়ে উঠলো লেলিহান শিখা। কিন্তু ওমা! সেই আগুনের মাথায় নাচছে কে? ও যে তাদের ভাই লিঙ্গো! তাণ্ডব নাচছে যেন! অথচ কি ফুর্তি তার! ঐ দেখো! সে যা আঠারোটা বাদ্যযন্ত্র বানিয়েছিলো, সবকটা একসাথে বাজিয়ে চলেছে নাচতে নাচতে!

divider
ডেপুটি কমান্ডার জোসেফ র‍্যান্ডাল ছাড়াও আরো অনেক সামরিক কর্মী উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল বস্তারে – ২০৬৭ থেকে ’৬৯-এর মধ্যে – কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই উচ্চপদস্থ নয়। কারণ একমাত্র র‍্যান্ডাল অরণ্যে নামতেন, বাকি উচ্চপদস্থের মত আকাশ থেকে নজর রাখতেন না বস্তারের উপর।
তার সুইসাইড বম্বিং একদিক দিয়ে কর্পোরেশনকে স্বস্তি দিয়েছিল, কারণ কর্তারা জানতেন যে উচ্চমহলে র‍্যান্ডালের উন্মাদনা বিকশিত হলে তিনি এমন একটি ক্লাসিফায়েড সিক্রেট (বা স্ক্যান্ডাল) ফাঁস করে দিতেন যেগুলি নিম্নপদস্থরা বললে অ্যাসাইলামে পাঠানো যায়, বা ফিরিয়ে দেওয়া যায় তাদের গ্রামে বা অন্যথা, ব্যবস্থা করা যায় যাতে সেইখান থেকে তারা কোনোদিনও বেরোতে না পারে।
ফুটসোলজার আশুতোষ নায়েক সেরকমই এক উন্মাদ। তাকেও দেশের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল কর্পোরেশন – ভারতবর্ষের রাষ্ট্রের অধীন একটি গ্রামে। কিন্তু তার সাইকোসিস একটু ভিন্ন খাত ধরে এগোয় – হিমাচল প্রদেশের পরিবেশরক্ষার অ্যাক্টিভিজমে জড়িয়ে পড়ে সে। রীতিমত খবর হয়ে যায় যে একজন প্রাক্তন সৈনিক জঙ্গল সাফ করার বিরোধীতায় প্রায় জান দেওয়ার জন্য তৈরি। মিডিয়ায় সে বলতে থাকে যে মানুষের বহুদিন ধরে চালানো প্রকৃতি-ধর্ষণের প্রায়শ্চিত্ত সে করছে – গাছ, অরণ্য, জঙ্গল, নদীকে সে বুকের খুন দিয়ে বাঁচাবে। কর্পোরেশনের টনক নড়ে, নায়েক এতটা উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে কারণ নায়েক আসল যে কথাটা বলতে চায় সেটা সে বলতে পারছে না। কর্পোরেশনে এই কথার আন্দাজ দেওয়ার পরেই তাকে রিটায়ার করে দেওয়া হয়। সে এখন আর বলতে পারছে না কর্পোরেশনের আতংকে নয়, ‘মাদারচোদ’ কর্পোরেশনকে সে নাকি ভয় পায়না, তার আতংক ভিন্ন। সে এই আতংকের সম্মুখীন হয়েছিল যে মুহুর্তে – সেই মুহূর্তের অভিঘাতই তাকে তাড়িত করে বেড়ায়। সেই আতংক থেকে সে হাজার প্রায়শ্চিত্ত করেও মুক্তি পাচ্ছে না।
কারণ র‍্যান্ডালের মত সেও একদিন বস্তারের অরণ্যে দেখে ফেলেছিল সমস্ত কমান্ডোর গুপ্ত ঘাতককে, যারা এক এক করে সাইবর্গ সেনানীকেও ঘাড় মটকে ফেলে দেয়, ঝুলিয়ে রাখে উচ্চতম ডালে, টেনে নিয়ে যায় বটবৃক্ষের ফাটলে।
তারা কোন মানুষ তো নয়ই, জানোয়ারও নয় – তারা এই অরণ্যের গাছ।
আশুতোষ নায়েক দেখেছিল কীভাবে একটি ডাল হঠাৎ নেমে এসে পেঁচিয়ে ধরেছিল একজন সৈনিকের গলা, টু শব্দ করার আগেই গাছটা আধামানুষটাকে তুলে নিয়ে শুন্যে দিয়েছিল ঝাঁকুনি (যার ফলে স্পাইন তিন টুকরো হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক), তারপর আরেকটা ঝাঁকুনি দেওয়ার ফলে লোকটার মাথা থেকে যায় গাছের ডালে প্যাঁচানো আর শরীর আছড়ে পড়ে মাটিতে।
আশুতোষকে ভয়ে পাঙশুটে হয়ে যাওয়া ভূষণ সইকিয়া তিন মাস আগেই বলেছিল যে এই জঙ্গলে অনেক গাছ, লতা উদ্ভিদ এসেছে যেগুলি আগে ছিল না। বলেছিল সে করমত্থ, সেগুণ, সরাই, সজা, বীজা, সলীহা, সাইমার, বোডাগা, ডোডেরা সব চেনে, কিন্তু এখন প্রতিদিন সে অন্তত তিনটে করে গাছ-লতা দেখছে যেগুলোকে সে আদপেই চেনে না! ভূষণ তিন সপ্তাহ বাদে সুইসাইড করে।
কর্পোরেশনের একজন অ্যাসাসিন এখন ছায়ার মত আশুতোষের সঙ্গী, কোনোদিনও সে যদি তার অব্যক্ত আতংককে মিডিয়ার সামনে ভাষা দিয়ে ফেলে – সেই স্থানেই হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া আছে তাকে।
কলকাতায় সুহৃদ মন্ডল বস্তার নিয়ে একটি ঐতিহাসিক গল্প লিখতে বসে থমকে থাকে – কি লিখবে সে? কোন গল্প? গল্পকে কি সে ফ্যান্টাসির ছাঁচে ঢালবে – যাতে পাঠকদের বিশ্বাস করার প্রশ্নই না আসে? অথচ যে গল্প সত্যে অমোঘ?

divider
একদিন রিখি চোখের আড়াল হয়েছিল কিছুটা, এক আগন্তুক ওকে একটি চারাগাছ দিয়ে চলে গিয়েছিল। ফিলোমেলা চমকে গিয়েছিল মেয়ের হাতে, টবের মধ্যে পাঁচ আঙুলের হাতের মত দেখতে চারাগাছটি দেখে – গাছটা সে চেনেনা – কিন্তু লোকটা কে? তারপর থেকে মেয়েকে কাছছাড়া করেনি কখনো ফিলোমেলা; শুধু ভাবতো সেই আগন্তুক কে, যে মেয়ের সাথে আলাপ করে দিয়ে গেল একটি চারাগাছ? রিখির বর্ণনায় মনে হয়েছিল একজন প্রৌঢ়।
তার সাথে ফের দ্যাখা হলে যদি রিখি তাকে মায়ের বলা গল্পগুলো বলে – সেই আগন্তুক কি বলবে যে হ্যাঁ এই গল্পগুলো সত্যি? যে লিঙ্গো-পেনের সঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে একদিন আকাশ থেকে নেমে এসেছিল এক অপার্থিব মহাকাশযান? যে মোষকুঁজ পাহাড়ের গভীরে হাজার হাজার বছর ধরে ঘুমন্ত ছিল সেই যান – যাকে সভ্য মানুষের আড়ালে রাখা ছিল গোন্ডদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের লালন করা গোপন ও পবিত্র দায়িত্ব? যে লিঙ্গো-পেনের চুম্বক লকেট আসলে এমন এক ধাতুর তৈরি যা এই ধরনীর কোন খনি খুঁড়ে কর্পোরেশন খুঁজে পাবেনা কখনো? যে সেই লকেট দূরতর গ্যালাক্সিতে পাঠিয়ে দিচ্ছে বস্তারের মানুষ কেমন আছেন তার খবর? যে আগুনের মাথায় নাচতে থাকা সেই লিঙ্গোপেন মানুষ-লিঙ্গোপেন নন, তার অপার্থিব বন্ধু – যে পৃথিবীতে কিছুদিন মাত্র ছিল জীবনাবসানের আগে? এবং সেই অপার্থিব তার পরম বন্ধু লিঙ্গো আর তার কৌমকে মৃত্যুর আগে বলেছিল যে একদিন – হাজার হাজার বছর পরে – উল্কার মধ্যে লুকোনো মহাকাশযান করে তার গ্রহের বন্ধুরা পৃথিবীতে আবার আসবে, সেই মহাকাশযান এলে শোনা যাবে মহাকাশময় গোন্ডদের আদিদেবতার সুরে আঠারোটা বাদ্যযন্ত্রের সমবেত সঙ্গীত, সেই সঙ্গীতের ডাকে মাটি-খনি ফুঁড়ে জেগে উঠবে মোষকুঁজের ঘুমন্ত মহাকাশযান আর শতাধিক বছরের অত্যাচার থেকে মুক্ত হবে গোন্ডরা, তাদের এক অপার সমৃদ্ধির এবং নির্বিঘ্ন অরণ্যের মাতৃগ্রহে নিয়ে যাবে আগন্তুক অপার্থিবরা, আর বস্তারে ছড়িয়ে দেবে ঝাঁকে ঝাঁকে অপার্থিব গাছ-লতা-গুল্মের বীজ – জন্ম নেবে এমন একরাশ বিবর্তিত সেন্টিয়েন্ট উদ্ভিদ যারা মানুষের একতরফা মার আর খাবেনা, উলটে অনির্বচনীয় মার দেবে।
যেরকম একটি উদ্ভিদের চারাকে কলকাতার মাটিতে আদরে লালন করছে এখন সেই উদ্ভিদের মতই গোপনে লালনের, আদরে আগলে রাখার, সম্ভাবনায় অভূতপূর্ব রিখি হেমব্রম।

section divider

এই গল্পের সঙ্গেই ‘অপার্থিব’-র প্রোমো হিসেবে তিনটি গল্পের সমাপ্তি ঘটলো – প্রথমটা এখানে পাবেন, দ্বিতীয়টা এখানেএই গল্প পুরোপুরি আমার লেখা কিনা তাও সন্দেহ আছে, কারণ গল্পের দীর্ঘতম অংশটি – যেখানে গোঁড় উপজাতির লিঙ্গোপেনের গল্প বলা আছে – অতীন্দ্রিয় চক্রবর্তীর ‘বস্তার দূঃশাসনীয়’ থেকে তুলে নেওয়া (তার অনুমতি না নিয়েই)। ‘বস্তার দূঃশাসনীয়’ ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল গুরুচন্ডালী ওয়েব ম্যাগাজিনে। গুরুচন্ডালীতে প্রতিটি সংখ্যার লিংক আমি পাইনি, তাই প্রথম পর্বের লিংকটি দিয়ে রাখলাম। অতীন্দ্রিয়র লেখাটি আমার লেখার চাইতে অনেক জরুরী পাঠ্য।
এই গল্পটি সেঁজুতি দত্তকে উৎসর্গ করলাম।

I will request readers not to republish this work of fiction without attribution, or adapt it into any other derivative form for commercial purpose without the permission of the writer
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.

All Characters d

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s