ট্রিন-টি আর সেই লোকটা

প্রায় ভোররাতের দিকে তরুণ সৈনিকটি এই দেশের শেষতম স্টেশনটিতে এসেছিল। সেই সন্ধ্যে থেকেই ভারি, হালকা, ঝিরঝিরে – বিভিন্ন মাত্রার বৃষ্টি পড়ে চলেছে।
ও একা আসেনি, পুরো রেজিমেন্টটাই এসেছে। আর দূরে একগাদা গ্রাম্য গরীবের ভিড় তাকিয়ে আছে ওদের দিকে – তাদের মধ্যে একটি বালিকা আছে বছর সাতেক বয়সের। তার নাম ট্রিন-টি। তরুণ সৈনিকটির নাম এই গল্পে প্রয়োজনীয় নয়, সে একটি নাম্বার মাত্র।
প্রায় দশটি সামরিক ট্রাক বোঝাই হয়ে এলো ঘন্টা দেড়েক পরে। রেজিমেন্টের সবার বন্দুকের সেফটি ক্যাচ অন না করে রাখতে বলা হয়েছিল। অমোঘ সময়ে প্রয়োজন হলে সত্তরখানি স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের হার্মোনাইজ্‌ড ক্লিক শুনতে ভালোবাসেন কর্পোরেশনের কমান্ডার। কিন্তু আমাদের তরুণ সৈনিকটি একবার বিদ্যুৎ গর্জে ওঠার সময়ে সেই ক্লিকটির শব্দ আড়াল করে নিয়েছিল। ট্রিন-টির শ্রবণশক্তি প্রায় কুকুরের মত – সে অন্য মানুষের চাইতে বেশি শুনতে পায়, অনেক শব্দের মধ্যে একটি শব্দ তুলে নিয়ে আসতে পারে – সে ক্লিক শুনতে পেয়েছিল। আর তখন, যেহেতু অতগুলো সৈন্যর মধ্যে মাত্র একজনই ‘ক্লিক’ করেছে, তার দিকে ঠায় তাকিয়ে ছিল ট্রিন-টি।ট্রিন-টির চোখের ভেতরে একশ বছর আগেকার কোনো দৃশ্য ভেসে উঠলো। সেটা যে একশ বছর আগেকার তা ওর বোঝার কথা নয়, কিন্তু ওর চোখে যে দৃশ্যগুলি মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে – সেই সব দৃশ্যের বয়স আন্দাজ করতে ও শিখে গেছে। দৃশ্যগুলি উঠে আসে ল্যান্ডস্কেপ থেকে। এই যে বৃষ্টির ছাটে ভেজা নষ্ট হয়ে যাওয়া চাষের ভূমি, এই যে জলের মধ্যে হালকা অ্যাসিড যা মানুষের চামড়া একটু একটু করে নষ্ট করে দেয়, আরো ধীরে ক্ষতি করে দেয় গাছের, ধানের, ঘাসের – তার ওপর পড়তে থাকা ঝিরঝিরে বৃষ্টির পর্দায় সে দেখতে পায় অতীতের আরো সুস্থ, সবুজ প্রকৃতিতে দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধ ইউ এস মেরিন। না, তারা যে ইউ এস মেরিন সেটা বোঝার ক্ষমতা বা জ্ঞান ওর নেই। ল্যান্ডস্কেপ ট্রিন-টিকে তার আস্তিনে লুকিয়ে রাখা ইতিহাসের দৃশ্য দেখাতে থাকে।
ট্রাক থেকে ওরা নামছে। কয়েকশ তরুণ-তরুণী – ওদের সীমান্ত পেরিয়ে ছেড়ে আসবে একটি ট্রেন, দেশের শেষ স্টেশন থেকে এই যাত্রা শুরু হবে ওদের অন্য দেশে নির্বাসিত করার জন্য। কর্পোরেশন যখন এভাবে তুলে নিয়ে যায় মানুষকে তখন কি আর তার দেশে নিয়ে যায়? কর্পোরেশনের কি কোনো দেশ থাকে?
এখন ওদের রেললাইনের ধারে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হল। আকাশে মেঘে লালচে আভা। আবার ঝেপে বৃষ্টি আসবে, হাওয়া নেই। যখন জোরে বৃষ্টি পড়বে অ্যাসিড থেকে বাঁচতে সবাইকে পালাতে হবে। ট্রিন-টি আর ওর সঙ্গীরা পালাবে না।
বৃষ্টি এলো ঝিরঝিরিয়ে, বড়রা পালালো, ছোটরা কেউ পালালো না। তরুণ সৈনিকটি ভারি, রুক্ষ মেটালের পোষাকের তলায় ঘামছে। ওর কানের ভেতরে ইমপ্লান্ট করা আছে মাইক্রোচিপ, ও এমন অনেক কিছু শুনতে পায় যা সিভিলিয়ানদের শোনার কথা নয়। কিন্তু ও ট্রিন-টির মতো বেছে বেছে শব্দ শুনতে পারে না। বরং ঝিরঝিরে বৃষ্টির শব্দ শব্দের দেওয়াল হয়ে ওকে – ওর মত অনেক আপাদমস্তক সিন্থেটিক সজ্জায় মোড়া সৈনিককে – বধির করে দিচ্ছে। মুখের সামনে স্বচ্ছ গ্লাসের ফ্রন্টপিস বেয়ে, হেলমেটের কার্নিশ ধরে জল পড়তে লাগলো চোখের সামনে ছেঁড়া পর্দা হয়ে। সেই জলের পর্দা দুলছে, আর দ্যাখা যাচ্ছে দাঁড় করিয়ে রাখা একটি মেয়ের শরীর, পিছন থেকে, পোশাক লেপ্টে আছে শরীরে, শরীরের ভাঁজে। একবার শৈশবের একটি দৃশ্য মনে এলো সৈনিকটির – কার্নিশ থেকে জমা বৃষ্টির জল পড়তে দ্যাখা সারা দুপুর একা একা – আর ওইদিকে বাড়িটার ছাদে মরশুমের প্রথম বৃষ্টিতে নৃত্যরত একটি মেয়ের মূর্তি – পিছন থেকে দেখা। অনেকবার বারণ করা হয়েছে ওকে, কিন্তু তাও গ্লাভসের ট্রিগার-ফিঙ্গারটা সৈনিকটি কেটে রেখে দিয়েছিল। ধাতব ট্রিগারটার শীতলতা দুবার অনুভব করে নিলো ও।
সামনে দেহগুলো ভিজছে, কাঁপছে সারিবদ্ধ যৌবন যার স্বাদ সৈনিক পায়নি কখনো। বৃষ্টির ছাঁটে জ্বালা করছে ওদের। ট্রেন আসছে।
ট্রিন-টি আগত ট্রেনের ধূসরতায় একশো বছর আগেকার লোকোমোটিভ দেখতে পেলো। না, ওর বোঝার কথা নয় সেটা একশো বছর আগেকার লোকোমোটিভ।
কি যেন দেখে অস্থিরতায় চঞ্চল হয়ে উঠল তরুণ সৈনিকটি। মনে হল কমান্ডার প্রস্তুত হতে বলছেন না কেন? ট্রেন আসার পরও ফালতু প্রোটোকল চলছে কেন? দেহগুলো ভিজতে ভিজতে, ঠান্ডায় আর জ্বালায় কাঁপতে থাকে লাইনের ধারে। ডিসিপ্লিন, কমান্ডারের খুব প্রিয়। সমস্ত সেফটি ক্যাচ ক্লিক করা হবে একসাথে, সমস্ত বন্দুক এম করা হবে একসাথে। ফায়ারিং – অন্তত প্রথমটা যেন অর্কেস্ট্রেটেড হয়। বাকিটা এক একটি মেশিনের এক এক রকমের স্বয়ংক্রিয়তার ছন্দে চলবে। সৈনিকের মনে পড়লো – ফরিদপুরের বাড়িতে তার মা সেলাই কল চালাচ্ছেন – সারা দুপু্র, একা একা। ফায়ারিং-এর সময়ে বন্দুকের চেম্বারটায় মায়ের হাতে সেলাই কলের মতো একটা শব্দ হতে থাকে।
অর্ডার। হার্মোনি। ডিসিপ্লিন। এক লহমা সৈনিকটির মনে হল যে ও হ্যালুসিনেট করছে – ফায়ারিং স্টান্সে ভূমির সাথে সম্পূর্ণ হরাইজনটাল হওয়ার আগেই ওর মেশিনগান চলতে আরম্ভ করবে। তাই প্রথম দুটো বুলেট মাটিতে বিধবে – তৃতীয়টা থেকে সব গুলি সামনের মেয়েটির নিতম্ব ঝাঁঝরা করতে থাকবে। ঈষৎ ঘেমে গেল ও। তারপর ভাবলো – যদি এমনটা হতই, কমান্ডারের কমান্ডের আগেই যদি ওর বন্দুক চলতে শুরু করতো – তাহলে যে ক্যাওসটা খাঁচাছাড়া হত – ওর বন্ধুরাও কি তার ধাক্কায় আরম্ভ করতো প্যানিক ফায়ারিং? সব বন্দুক চলতে আরম্ভ করতো কি কোনো ডিসিপ্লিনের তোয়াক্কা না করে? কিন্তু কমান্ডার ডিসিপ্লিন ভালোবাসেন, এবং ব্যত্যয় হলে শাস্তি কড়া। তাই হয়তো প্যানিকটা রেললাইনের ধারেই হওয়ার কথা, ওই সম্ভাব্য নিহতদের মধ্যে, সম্ভাব্য ঘাতকদের মধ্যে নয়। আধামানুষ, আধামেশিন এই সৈনিকগুলোর মধ্যে নয়।
কিন্তু এখন হ্যালুসিনেশনের সময় নয়। সেই যবে থেকে পেটের দায়ে মা ওকে প্রায় দান করে দিলেন কর্পোরেশনের সামরিক ইউনিটে আর ওর শরীরে ইমপ্লান্ট হতে থাকলো নানারকম চিপ্‌স – হ্যালুসিনেশন হতেই থাকে মাঝে মাঝে। ক্যাম্পে বায়োজেনেটিক্সের প্রধান বলেছিলেন এগুলো সাইডএফেক্ট। হতেই পারে, হয় মানসিক দৃঢ়তা বাড়াতে হবে, না হলে ওষুধ খেতে হবে।
ট্রিন-টি দেখতে পাচ্ছে ইউ এস মেরিনদের বন্দুক চলছে, লুটিয়ে পড়ছে চাষাভুষোদের শরীর – একশো বছর আগে।
কমান্ডার অস্থির হচ্ছেন তার বদলে – অ্যাসিড বৃষ্টি স্পেসিমেন নষ্ট করে দিচ্ছে! তার একটা কমান্ডের সাথে ট্রেনের ক্যারেজগুলোর দরজা খুলে গেল। ওরা উঠছে এক এক করে, ভবিষ্যতহীন তরুণ-তরুণীরা। ক্যারেজগুলোয় কোনো জানালা নেই। একটা ক্যারেজের যা ক্যাপাসিটি তার তিনগুন বেশি শরীর ঢুকছে। সৈনিকটির মনে হল বন্দীদের মধ্যে কেউ একজন স্লোগান দিয়ে উঠুক, তুলে নিক ঢিল-পাথর, তারপর চাবুকের মত আসবে কমান্ড, চলবে গুলি!
কিন্তু তা হল না। কি একটা ইমেজ যেন ওর মাথায় খচখচ করছে। ওরা কোনো শব্দ করছেনা। তরুণ সৈনিকটি বুঝতে পারলো যে ওর ট্রিগার ফিঙ্গারটি তিরতির করে কাঁপছে; কমান্ড এলে কাজ করার আগে আঙুলগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দেরি হয়ে যাবে দুই সেকেন্ড।
দরজা বন্ধ হলো একে একে। আকাশে লালচে আভা, ভারি মেঘের কন্ট্যুরগুলো মাঝে মাঝে আলোকিত হয়ে উঠছে। বৃষ্টি ভারি হয়ে এল। একটা অনন্ত প্রতীক্ষা শেষ হল যেন, ট্রেনটি চলতে আরম্ভ করলো। শেষ ক্যারেজটা যখন প্রায় একশো মিটার পূবে তখন কমান্ডারের কন্ঠে পরের কমান্ডটি আসে – ‘জোকার্স! টার্ন অ্যারাউন্ড!’ তরুণ সৈনিকটি নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গেল ডাইনে; তখন সে বুঝলো যে সামনের – এতক্ষণের ডাইনের – সৈনিকটিকে সে চেনে না। আফ্রিকান ছেলেটার একটা চোখ নেই, তার বদলে বায়োইলেকট্রনিক চোখ। ওর চাইতে আপগ্রেডেড সোলজার।
আরেকটি বিদ্যুৎ ঝলকে ওঠার আগেই কমান্ডারের গর্জন – ‘ডিসপার্স জোকার্স!’ সেফটি ক্যাচটা নিরাপদ জায়গায় ঠেলে দিলো সৈনিকটি। তারপর ছন্দে ছন্দে, ভিজতে ভিজতে ফিরতে থাকলো। কমান্ডার কমান্ডটি কেন দিলেন না? কি প্রয়োজন কর্পোরেশনের এই পোড়া ছেলেমেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার? সব তথ্য সৈনিকদের কাছে থাকে না। তরুণটি এগোতে এগোতে ছেলেবেলার আরেকটি ইমেজ খুঁজতে থাকে – খুঁজে পায় না।
কিন্তু ট্রিন-টি দেখেছে কোন দৃশ্য সৈনিকটিকে প্রায় প্যানিক ফায়ারিং-এর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ছেলেটির কোনোদিনও মনে পড়বে না।
ট্রিন-টি দেখেছিল যে যাদের নির্বাসন দেওয়া হল, ট্রেনে ওঠার আগে তারা একে অপরের আঙুল, কনুই ছুঁয়ে ছিল। স্পর্শে স্পর্শে, ভীতিতে ভীতিতে, অপমানে অপমানে সঞ্চারিত করে নিচ্ছিলো ওইসব যুবক-যুবতীরা একটি কল্পিত স্বদেশ, তাদের নিজস্ব ইতিহাসের পরিসর, আসলে যেটি একটি সময়ের খন্ড দিয়ে তৈরি, যে সময়টা আজকেই শেষ হল, যে সময়টা থেকে বিতাড়িত করা হচ্ছে তাদের। দেশ নামে ভূখন্ড থেকে তাড়ালে দেশ নামে সেই সময়ের বৃত্তের মধ্যে ওরা থেকে যাবে। স্পর্শের মন্ত্রে, স্পর্শের বৃত্তে ওরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছিল – যখন পাশের অচেনা ছেলেটির আঙুল ছুঁলে, কনুইয়ের কাছে অচেনা স্পর্শ লাগলেও মেয়েটির মনে হয় বন্ধুর হাত। সেই সময়ের বৃত্তে এই তরুণ সৈনিকটি নেই, ওর কোনো স্বদেশ নেই, নেই কোনো স্পর্শের অন্তরঙ্গতা। তাই ওকে গ্রাস করেছিল নির্বান্ধব নিঃসঙ্গতা।
বৃষ্টিতে – দেশের শেষ স্টেশনের ধূধূ অনন্তের সীমানায় – হিমেল ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতেও আরাম লাগছিলো ট্রিন-টির। ছেলেমেয়েগুলোকে দেখে এইটুকু ট্রিন-টির তিনমাস আগের কথা মনে পড়ে গেল। আর মনে পড়ে গেল সেই বৃদ্ধের কথা, ওর একদিনের বন্ধু সেই বুড়োটা।

divider
বুড়োটা ওদের মত দেখতে না। ওদের দেশের পুরুষদের চাইতে অনেক লম্বা। ওদের দেশের বুড়োদের মত শীর্ণকায় নয়, ভারি চেহারা। ওদের দেশের বুড়োদের মত থুতনিতে অল্প দাঁড়ি না, মুখভর্তি সাদা দাঁড়ি, মাথাভর্তি সাদা চুল। লোকটার চোখ ছোট –  ওদের যেমন চোখ, সেরকম না। না ওদের দেশের লোকেদের মতো দেখতে লোকটা, না কর্পোরেশনের সৈনিকদের মতো, না ট্রিন-টির দৃষ্টিতে ভেসে ওঠা ইউ এস মেরিনদের মতো।
লোকটাকে ওরা দেখেছিল যখন একরকমের রিফিউজি হয়েই ওরা এসেছিল হালং বে-তে। এককালে হালং বে-তে কত লোক বেড়াতে আসতো, ট্রিন-টির বাবা বলেছিল যে যুদ্ধের এক দশক আগে থেকেই – কিসব গোলমাল দানা বাঁধতে আরম্ভ করার পর থেকে – আর কেউ আসেনা। তারপর ওদের দেশ বেড়াতে আসা মানুষের পদক্ষেপ ভুলতে শুরু করে যখন এখানে স্পেস সেন্টারে গোলমেলে জিনিসপত্র ঘটতে থাকে। হালং বে – জলের মধ্যে টিলা, টিলার উপর অরণ্য। এখন জলের মধ্যে বিষ, অরণ্যের গাছ ভারি ও নুব্জ। অস্বাভাবিক রকমের ভারি কুয়াসায় আচ্ছন্ন থাকে হালং বে, তার সেই মনমাতানো রঙ হারিয়ে গেছে; চারিদিকে পরিত্যক্ত ঘর-বাড়ি, এককালের টুরিস্ট লজ। সেই পোড়ো প্রকৃতিতে ওদের গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছিল সত্তরজন – ট্রিন-টির পরিবারও – ওদের সবার শরীর রেডিয়েশনে পোড়া।
এসে দেখেছিল বুড়োটা ওখানে – একটা টিলার উপর জঙ্গলে – একা থাকে। লোকটার চামড়া পোড়া নয়, বিষজল ওর কোনো ক্ষতি করেনা, দূষিত ফলমূল মাছ দিব্যি হজম করে ফেলে। বুড়োটা ওদের বলেছিল যে ঠিক যেমন ওরা পালাচ্ছে বিকিরণ থেকে, বুড়োটাও পালাচ্ছে কাদের যেন তাড়া থেকে। তাই একে অপরকে লুকিয়ে রাখাই শ্রেয়, একে অপরের কাছে ধরা যখন পড়েই গেছে। ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বুড়ো – হুয়ান দাই জিজ্ঞেস করেছিলেন – ওরা নাহয় বুড়োকে লুকিয়ে রাখলো, কাউকে জানালো না বুড়োর কথা (ওদের সঙ্গে কাদেরই বা দেখা হবে আর?), বুড়ো ওদের কীভাবে লোকাবে রেডিয়েশনের হাত থেকে? ভারি মেঘ একদিন না একদিন তো এসে পৌঁছোবেই হালং বের আকাশে, বাতাস তো পৌঁছে গেছে। দুই বুড়ো দুইরকম কারণে হেসেছিল। অসুস্থতায় জর্জরিত ওরা আর দিব্যি সুস্থ বুড়োটা হালং বে-তে থাকতো, একে অপরকে বিরক্ত না করে।
ট্রিন-টি বুড়োটাকে দেখতো দূর থেকে, যেভাবে ট্রিন-টি অনেককেই দ্যাখে।
একদিন বুড়োটা ওকে ডেকে নিয়ে জিগ্যেস করে যে ও কি দ্যাখে এত।
“তোমার গায়ে আলো কিসের?” – ট্রিন-টি জিগ্যেস করে।
“কি আলো?” – বুড়ো শুধোয় – “কি দেখতে পাচ্ছো?”
“তোমার গা দিয়ে মাঝে মাঝে আলো বেরোয়।”
“তাই – এখন দেখতে পাচ্ছো?”
“না – মাঝে মাঝে দেখতে পাই।”
“ইন্টারেস্টিং! আর কি দেখতে পাও? কবে থেকে দ্যাখো?”
“যুদ্ধ যখন থেকে শুরু হল। পুরোনো যুদ্ধ দেখতে পাই। জঙ্গলে আগুন ধরেছে – আর আকাশে লোহার ফড়িং।”
“লোহার ফড়িং?” – লোকটা বালিতে একটা ১৯৬০-এর মডেলের বেল ইউ এইচ ওয়ান হুই হেলিকপ্টার আঁকে – “এরকম?”
“হ্যাঁ। তুমিও দেখতে পাও?”
“ইন্টারেস্টিং! ফ্যাসিনেটিং! দেখি তো -” লোকটা ট্রিন-টির মাথার দুপাশে হাত রেখেছিল – “ইউ আর মিউটেটিং!”
ট্রিন-টি ওসব কিছু বোঝেনি। ও জিগ্যেস করেছিল –
“তুমি ডাক্তারি করো?”
“কে বললো সেটা?”
“আমি দেখলাম একদিন। তোমার হাতে সাপ কামড়ালো, সেটা তুমি ঠিক করে নিলে”।
“সে তো তুমি আসার অনেক আগে!” – লোকটা আবার অন্য ভাষায় বিড়বিড় করতে থাকে – “শি ক্যান সি টাইম!”
“তুমি জঙ্গলে থাকো কেন? তুমি তো জঙ্গলের লোক ন’ও।”
“নই? সেটাও দেখে ফেলেছো?”
ট্রিন-টি হাসে। না, সেটা সে দ্যাখেনি। সেটা তার বুদ্ধি বলছে।
“আমি একটা সময়ে – খুব মজার একটা সময়ে – জঙ্গলে কাটিয়েছিলাম অনেকদিন। তাই মনে হল আরেকবার জঙ্গলে থাকি – বুঝলে?”
ট্রিন-টি তাকিয়ে থাকে বৃদ্ধের দিকে।
“তুমি কে?”
“যদি বলি আমি অন্য পৃথিবীর মানুষ? অপার্থিব?” – মিটিমিটি হাসে বুড়োটা।
ট্রিন-টির কাছে এই কথাটির বিশেষ কোনো চমক আনে না, যেন বিশ্বাস করার ওর কাছে কোন কারণই নেই যে অন্য পৃথিবী বলে কিছু থাকতে পারে না।
“তুমি আমার লোকগুলোকে ঠিক করে দেবে?”
“কি হয়েছে ওদের?”
“বাবা বলছিলো আমরা আর কেউ বেশিদিন বাঁচবো না। যুদ্ধে কিছু একটা হয়েছে – দেশ পচে যাচ্ছে। আমাদের চামড়া মাংস পচে যাচ্ছে। আমাদের পাঁচটা গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, কোত্থাও থাকতে দিচ্ছেনা।”
“ঠিক তো করে দিতেই হবে। তোমরা তো স্পেশাল!”
“কি করে ঠিক করে দেবে?”
লোকটা মিটিমিটি হাসতে থাকে। তারপর ট্রিন-টিকে যত্ন করে ফল-মূল খাওয়ায়। আর বুঝিয়ে দেয় – পৃথিবী এখন আটটা কর্পোরেশনের দখলে। স্পেস সেন্টারে যে বিস্ফোরণটা ঘটেছে এক বছর আগে তার দূষণ যেমন এ দেশের শহরগুলোকে মানবশুন্য করে দিচ্ছে, নষ্ট করে দিচ্ছে প্রকৃতি-পরিবেশ, তেমনই রেডিয়েশনের ফলে কিছু কিছু মানুষের অজানা মিউটেশন হচ্ছে। মানুষ পালটে যাচ্ছে – কিন্তু যেহেতু এদের কারুরই আয়ু আর বেশিদিনের না তাই মিউটেশন ঠিক কি পাল্টাচ্ছে তা ঠাওর করা যাচ্ছে না। এখন যে যুদ্ধ চলছে তা ঠিক একশো বছর আগের মত ন্যাচারাল রিসোর্সের উপর দখলদারীর জন্য নয়, রেডিয়েশনে মিউটেটিং স্বল্পায়ু মানুষের স্পেসিমেনের ওপর মালিকানার জন্য। কর্পোরেশন এই মানুষগুলোকে নিজেদের দখলে রাখতে চায়, বুঝতে চায় তারা আদপেই কীভাবে পাল্টাচ্ছে, কীভাবে তাদের ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সেয়ানে সেয়ানে যুদ্ধ চলছে – স্পেসিমেন লুঠ হয়ে যাচ্ছে মাঝরাস্তায়। ট্রেনভর্তি, জাহাজভর্তি স্পেসিমেন যদি হাতাতে না পারে প্রতিদ্বন্ধী কর্পোরেশন, বোমায় ধ্বংস করে দিচ্ছে। এখন ওরা বিশেষ করে খুঁজছে শিশুদের, যাদের ইম্যুনিটি কিঞ্চিত বেশি বলে তারা বেশিদিন টিকে যেতে পারে, অতএব যাদের উপর পরীক্ষা করলে সময় বেশি পাওয়া যাবে, সাফল্যের সম্ভাবনাও বেশি।
কি কারণে যেন কথা বলার সময়ে লোকটা ট্রিন-টির চোখে সভ্যতার চাইতেও পুরোনো একজন প্রজ্ঞাবান বৃদ্ধের মত হয়ে গেল। বা বলা যায় প্রজ্ঞা ব্যাপারটা এই প্রথম অনুভব করলো ট্রিন-টি। বৃদ্ধও বুঝলেন যে ট্রিন-টি সব কথা বুঝছে না, কিছুই বুঝছে না প্রায়। কিন্তু তাও তিনি বললেন, যাতে কথাগুলো ট্রিন-টির মনের ভেতরে যত্ন করে রাখা থাকে, যাতে বুঝতে পারে ভবিষ্যতে, যে ভবিষ্যতকে সুনিশ্চিত করতে হবে তাকে এখনই।
“এবার চলো তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি – বাড়ির লোক চিন্তা করছে” – হালং-এর মধ্যেখানে একটা টিলায় থাকে লোকটা, ওরা থাকে পারে, পরিত্যক্ত ঘরবাড়িতে বসতি বানিয়ে। একটা ভেলায় পেরোতে হবে হ্রদ।
“চলো”।
“শোনো” – বুড়োটা ট্রিন-টির মুখের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে – “ধরো কাল থেকে যদি দ্যাখো আমি আর এখানে নেই, তোমার কি মন খারাপ করবে? আমি কি তোমার অতটা ভালো বন্ধু হলাম?”
“তুমি কোথায় যাবে?”
“আমাকে কর্পোরেশনের লোক খুঁজছে, আমিও তোমাদের মতন কিনা। কিন্তু আর লুকিয়ে লাভ নেই। ওইখানে” – আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বৃদ্ধ বললেন – “একটা স্যাটেলাইট আমাকে ধরে ফেলবে। আমি একা ছিলাম যখন তখন দেখতো না। তোমরা এলে, হঠাৎ এত লোক। এখন এইদিকে নজর পড়বে – তারপর আমাকে দেখে ফেলবে।“
“তুমি পালাচ্ছো কেন?”
“কারণ আমি কর্পোরেশনের কাছে বিপজ্জনক বলে, ফেরারি বলে” – বৃদ্ধ হাসেন – “তোমার যেমন স্পেশাল পাওয়ার আছে, আমারও আছে কিনা!”
“স্পেশাল পাওয়ার কি?”
“শোনো – কাল আমি চলে যাবো – কিন্তু তোমাদের কিছু একটা দিয়ে যাবো – তুমি কয়েক বছর পরে বুঝবে সেটা কি। তবে কাল থেকে দেখবে আস্তে আস্তে তোমার লোকেরা কেমন একটা যেন হয়ে যাচ্ছে। তুমি কিন্তু ঘাবড়াবে না। এটার মানে ওরা ঠিক হয়ে যাচ্ছে। বড়দের কিছুদিনের জন্য দেখে রাখা তোমার আর সব ছোটদের দায়িত্ব, ওরা নিজেদের দায়িত্ব নিতে পারবে না কিছুদিন – আমি সব খাবারের ব্যবস্থা করে রেখে যাবো আমার শ্যাকে। তারপর একদিন দেখবে তোমাদের সব অসুখ ঠিক হয়ে গেছে”।
“কি করবে তুমি?”
“ম্যাজিক!”
“ম্যাজিক কি?”

divider

ট্রিন-টি দেখতে পেয়েছিল সব। কারণ সেই রাতে ওর ঘুম আসছিল না। দেখেছিল ভোরের দিকে জঙ্গলের পারে ওদের ভাঙাচোরা ঘরদোরের কাছে এসেছিলেন সেই বৃদ্ধ। এসে অনেকক্ষণ ধরে ক্রমে নষ্ট হতে থাকা প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থেকে এক সময়ে কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে ট্রিগার টেপেন। আওয়াজ হয়নি। বৃদ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন। আর ট্রিন-টির মনে হয়েছিলো যে ভালো বুড়োটার শরীর থেকে একটা মায়াবী আলোর ঝাঁক বেরিয়ে এসে সমস্ত ঘুমন্ত মানুষের দিকে ধেয়ে এসে মিলিয়ে গেল।
তারপর ওর খুব ঘুম পায়।
ঠিক দিন পনেরো বাদে এসেছিল কর্পোরেশনের মিলিটারি। ট্রিন-টির মানুষগুলো তখন বেবাক বোকা, সমস্ত জুলুম মেনে নিচ্ছে নিঃশব্দে। লোকগুলো মাটি খুঁড়ে বের করেছিল বৃদ্ধের মৃতদেহ। ওরা – মিলিটারিরা – দেহ নিয়ে চলে যায়। আর সঙ্গে নিয়ে যায় ওদের তিনজনকে। কিন্তু মিলিটারি না পেরোতে পেরেছে সমুদ্র, না দিতে পেরেছে হাওয়ায় পাড়ি। হঠাৎ আকাশ থেকে একটা উল্কার বৃষ্টি এসে আঘাত করায় জাহাজ, উড়োজাহাজ সব তলিয়ে গেছিলো জলের তলায়। তারপর ওরা হালং বে ছেড়ে আরো কিছুটা দূরে কাট বা’য় আরো গভীর অরণ্যের ভেতর প্রবেশ করে।
তিন সপ্তাহ পরে সেই জঙ্গলেও রেড হয়। ট্রিন-টি এবং অনেক বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়া হয় ল্যাবরেটরিতে। কিন্তু লাভ হয়নি। রেডিয়েশনের চিহ্ন মাত্র ওদের শরীরে পাওয়া যায়নি, তাই যৌক্তিক ভাবেই বাকি পরীক্ষা-নিরীক্ষারও মানে থাকেনা কিছু। ল্যাব থেকে সবকটা বাচ্চাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
এখন ট্রিন-টি আর ওর বন্ধুরা দেশ জুড়ে ওদের মা-বাবাদের খুঁজছে। মেকং বদ্বীপ থেকে হা লং, কাট বা বহুদূর। ওরা জানে ওদের পরিবার, মানুষজন অসুখে মরবেনা, বেঁচে থাকবে যদি না গুলি করে দেয় সৈনিকরা, জঙ্গল জ্বালিয়ে দেয় তরল সিন্থেটিক পেট্রোলিয়ামের বিস্ফোরণে – মা-বাবারা, দাদু-দিদারা কোথাও না কোথাও আছে। কাট বায়ে পৌঁছোতে হবে।
ট্রিন-টি বুঝেছিল যে বুড়োটা কিছু একটা করেছিল। ম্যাজিক!
বৃদ্ধের ম্যাজিক কীভাবে ঘটেছিল বোঝার কথা নয় ট্রিন-টির। ঠিক যেভাবে ওদের দেশে ওদের মত লোক কেউ বোঝেনা কেন যুদ্ধ হচ্ছে, কেন একটি পারমানবিক দূর্ঘটনা ঘটলে বিকীরণে মানুষ মিউট্যান্ট হয়ে যেতে পারে, কেন মিউট্যান্ট হলে সেই মানুষদের গ্রাম থেকে, দেশ থেকে, পারলে গ্রহ থেকে তাড়িয়ে দিতে হয়। অথবা কেন কর্পোরেশনদের মধ্যে যুদ্ধ লাগতে পারে এইসব মানুষদের মালিকানা প্রকৃতির হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য।
মানুষ বোঝেনা, ট্রিন-টির মতো ছোট মেয়েরা তো বোঝেনাই। তবে ট্রিন-টি – জানে না কবে বন্ধুদের সাথে পুড়তে থাকা দেশ পেরিয়ে পৌঁছোবে সে কাট বা-র অরণ্যে, জানে যে পৌঁছোতে হবেই – এতটা জানে যে কর্পোরেশনের ম্যাজিক জানা নেই।
সেই তরুণ সৈনিকটি তার অবশিষ্ট আবেগ সম্বল করে দেশের ও মায়ের স্মৃতি হাতড়ে বেরোচ্ছিল, কিছু পাচ্ছিলো না আর স্থানীয় মেয়েগুলোকে দেখে জাগছিল ধর্ষণেচ্ছা। ট্রিন-টির কাছে দেশ আছে, কাট বা-য়ে ওর হাবাগোবা বোকাসোকা মা আছে, ট্রিন-টির স্মৃতিতাড়িত হওয়ার সময় নেই।
বুড়োটা ওর দেশের মানুষ কিনা, পৃথিবীর মানুষ কিনা কিইবা যায় আসে? বুড়োটা ওর বন্ধু ছিল তো! কর্পোরেশন কি মরে যাওয়ার আগে জলের দিকে, টিলার দিকে, গাছের দিকে, আকাশের দিকে, তারার দিকে – তাকিয়ে থাকে অতক্ষণ?
সত্যিই হালং বে’র সেই গোপন উদবাস্তু্রা সবাই সুস্থ হয়ে গিয়েছিল। নষ্ট চামড়া, পোড়া মাংস, ঝাঁঝরা ফুসফুস, কুষ্ঠ – সবকিছু সেরে গিয়েছিল তাদের। এখন ওরা বিষের জল, বিষের বাতাস, রেডিয়েশন – সব কিছু্র সঙ্গে যুঝতে যুঝতে পাল্লা দেওয়া আগামীর মানুষ। ওরা এখন নষ্ট হয়ে যাওয়া ভিয়েতনামের গোপন ভবিষ্যত।
বুড়োটা কিছু একটা করেছিল। ম্যাজিক!
কারণ এখন ট্রিন-টি আর পাঁচটা মানুষের চাইতে অনেক বেশি দেখতে পায়, শুনতে পায়। ট্রিন-টি দেখতে পায় অতীত, ভবিষ্যত। ট্রিন-টি দেখতে পায় বর্তমানের ঘনত্বে লুকিয়ে থাকা অমোঘ সত্যের ডিটেল ও অবয়ব। আগের মতন ছেঁড়া ছেঁড়া নয়, স্পষ্ট।

বৃদ্ধ কে এবং তার ম্যাজিকটাই বা কি ছিল সেটা বোঝার জন্য ‘অপার্থিব’ পড়তে হবে। এই গল্পগুলো লেখা মূলতঃ ‘অপার্থিব’-র প্রেক্ষাপট বোঝাতে, বা ওই জগতটা থেকে যে বিদায় নিতে হবে সেটাকে মেনে নিতে অসুবিধে হওয়ায়। তিনটি গল্পের মধ্যে এইটা দ্বিতীয়; প্রথমটি এখানে পাবেন

section divider

I will request readers not to republish this work of fiction without attribution, or adapt it into any other derivative form for commercial purpose without the permission of the writer
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.

All Characters d

Advertisements

One Reply to “ট্রিন-টি আর সেই লোকটা”

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s