আর্শি নগর

ঢাকুরিয়া ব্রিজের মাঝবরাবর হাঁ করা ভাঙা জায়গাটায় ওরা তিনজন বসে পা দোলাচ্ছিলো – গগন, ছিদাম আর ইউসুফ। নিচে রেললাইনটার উপর ঝুঁকে পড়েছে একটা বটগাছ – কি আজবভাবে জন্মিয়ে, বেড়ে, ডালপালা মেলে টিকে গেছে এমন যুগে যখন গাছপালা টিকতে পারেনা খুব একটা; যদিও পাতাগুলো সবুজ নয় ঠিক, সবজে বাদামী বলা যায়।
রাত এখন সাড়ে তিনটে – ওদের কর্মবিরতি রাতের এই কয়েক ঘন্টাই আর দুপুরবেলা এক ঘন্টা। আকাশে মেঘের সেই চিরকালীন ঘনঘটা, অনেক উঁচুতে এক আধটা বিদ্যুৎ খেলতেও দ্যাখা যায়। ছিদাম বললো যে ওরা যে ব্রিজের সবচাইতে উঁচু জায়গাটায় বসে আছে, বাজ যদি মাথায় এসে পড়ে? ইউসুফ ভর্ৎসনা করে – বলে যে আশেপাশের বাড়িগুলো অনেক উঁচু – বাজ পড়লে ওই দিকে টাল খেয়ে যাবে।
“আর মরলেই বা কি যায় আসে?” – গগন বললো।
“মাপ কর ভাই – আমার মরার ইচ্ছে নেই।”
“এভাবে বাঁচবি?” – গগন জিগ্যেস করে।
“আমার নালিশ নেই কোনো। পেট চালাতে গেলে লোকেদের কাজ লাগে। আমিও কাজ করে চলেছি ভাই, গ্রামের বাড়িতে বৌ-মা-বাবা আছে, টাকা পাঠাতে হয়।”
“ধর তোর ওই খোকাবাবু যদি এখন ঘুম থেকে উঠে বলে লাফ মেরে ওই দিকে যেতে – পারবি?” – ইউসুফ বিশ মিটার দূরে ব্রিজের বাকি অংশটার দিকে আঙুল তোলে, ভাঙাচোরা শরীর নিয়ে পঞ্চাননতলার দিকে মাথা নুইয়ে নেমে গেছে।
“খামোকা বলবে কেন? এসব আজগুবি হুকুম দেওয়া ব্যান হয়ে গেছে!”
“সে হয়েছে। কিন্তু চোরাবাজারে ওইসব নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঠিক যা যা ব্যান হয়েছে তাই করা হয়। প্রচূর টাকা বাজি ধরা হয়। সনকা মরলো কি করে? ট্রেনের উপর লাফ দিতে বলা ব্যান হয়ে যায়নি?”
“ওর মাস্টার ব্যান হয়ে গিয়েছে; পাঁচ বছর খেলতে পারবে না।”
“মেয়েটা তো মরলো” – গগন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে – “বুড়ি মা’টাকে কে দেখবে এখন?”
“আমি করবো না ওসব কিছু বললে” – ছিদাম নিজের পরিবারের ওমন অবস্থা ভেবে কেঁপে ওঠে একটু – “ডাউনগ্রেড করে দিলে দেবে। তারপর খেটে পয়েন্ট তুলবো। শোন মাইকেল ওইভাবেই চালাচ্ছে! পয়েন্ট তুলছে, আপত্তিজনক কাজ থাকলে করছে না, পয়েন্ট কমছে। কিন্তু ভালো কাজ করে, তাই মালিকও পেয়ে যাচ্ছে শিগগিরি। ভালো কাজ করলে কর্পোরেশন রেখে দেয় – কর্পোরেশন কিছু পেনাল্টি করেছে ওকে?”
“তোর মনে হচ্ছে কর্পোরেশনের উপর খুব তেল!” – গগন একটা সিগারেটের পাতায় তামাক রোল করছিল, এবার জিভে বোলায় পেপারের উঠে থাকা কোনাটা।
“শোন ভাই” – ছিদাম গলা তুলে বলে – “কর্পোরেশন বাঁচিয়ে রেখেছে, গ্রামে পরিবার খেতে পাচ্ছে। তোরা কিছু পড়াশোনা করিসনা, আমার আপগ্রেডেশনের সময়ে ডকুমেন্ট খুঁটিয়ে খুটিয়ে পড়েছি – ওরকম বেয়াক্কেলে কিছু হয়না যে লাফিয়ে পেরোতে বলবে!”
“তুই ডকুমেন্টই খুঁটিয়ে পড়িস শুধু। খুঁটিয়ে পড়ার মত আরো অনেক কিছু রয়েছে …।”
“তো তুই এই কাজে এলি কেন এতই যদি রাগ?”
“আমার কাছে কি এটা অপশন হিসেবে ছিল? টাকাটা লাগবে বলে করছি। তা বলে যা বলার তা বলবো না – সেটা হয়না। কাজ পেয়েছি বলে রাগ হবে না এটা হয়না।”
“কি করবি?” – ছিদাম গগনের মাথার পিছনদিকে আঙুল দিয়ে টোকা দেয়, ধাতব আওয়াজ আসে – “এটা ছাড়া পারবি?”
“পারবো কেন? এই যে হাওয়া থেকে বিষ ঢুকছে শরীরে – ঠেকিয়ে রেখেছে তো এটাই – কিছু না পেয়ে শুধুশুধু দিচ্ছি নাকি প্রানপাত করে? জীবন দিচ্ছে কর্পোরেশন!” – শ্লেষের সাথে বলে গগন। বাকিরা হাসে – ছিদামও বোকার মত হাসে, ইউসুফ বাজের ঝলকানির সাথে মিলিয়ে দেশলাই জ্বালে।
“জানিস আমি কেন এই কাজে আছি?” – গলা নামিয়ে ছিদামকে বললো ইউসুফ।
“আমি জানি কলকাতায় লুকানো দরজা আছে। আমি সেটা খুঁজে বের করবোই! শালা মাইলের পর মাইল লোক নেই – ভুতের বাড়ির মত বিল্ডিং! তার মধ্যে ভুতের মত আমরা প্লেয়ার্স! এই কাজে না থাকলে খুঁজতাম কি করে? হে হে – আমার গোপন মিশন আছে!” – ইউসুফ বলে।
ছিদাম চুপ। গগন একটু কন্ঠে উৎকন্ঠা এনে বলে – “তুই আবার আবোল তাবোল বলছিস – মাথাটা চুদে যাবে তোর – এসব ভাবিস না।”
ইউসুফ ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে ছিদামকে বলে – “তুই শুনেছিস লুকোনো দরজার কথা?”
ইউসুফের চোখ জ্বলজ্বল করছে। আকাশে চাঁদ নেই, লালচে আভার অন্ধকার, সূর্য ওঠার অনেকক্ষণ বাদে বোঝা যায় যে আলোর আস্তর পড়েছে শহরে। ভাঙা ব্রিজের ধারে সারি সারি হ্যালোজেন আছে, যেমন থাকার। আর কোত্থাও – চারিদিকে এই অতীতের ভুতে ভর করা শহরে – কোনো আলো নেই। এই আলোর অভাবে ছিদাম দেখলো ইউসুফের চোখ জ্বলজ্বল করছে।
“আমাদের মালিকরা কোথায় থাকে? আমাদের কারা চালায়? এই যে ড্রোন, ক্যামেরা, রোবট – এগুলো চালাচ্ছে কে? কক্ষনো মানুষ দেখেছিস যারা আমাদের মালিক?”
“যাঃ কলা” – ছিদাম এই অশরীরি অপরের উল্লেখে ভয় পেয়েছে না ছিদামের চাপা উত্তেজনায় বোঝা গেল না – “ওরা আছে তো – কর্পোরেশন, ইউজার …।”
“আমি বলেছি নেই? লোকে কি জানে? জানে যে অন্য দেশে আছে। তিরিশ বছর আগে তাই ছিল, যুদ্ধর পর আর নেই।”
“তাহলে কোক্‌থায় আছে?”
“কোথায় আছে? আগে সব শালা ওয়ার্কার্স রাইট্‌স নিয়ে কিচাইন পাকাতো। সব ভোম্বল হয়ে গেছে! মালিকেরই হদিশ নেই – টার্গেট করবে কাকে? রোবটগুলোকে?”
“নেশাভাং করছিস আজকাল!” – গগন কথাটা বলে ধূসর শহরের ত্রিসীমানার দিকে তাকিয়ে থাকে।
“এই শহরেই আছে মালিকরা! কর্পোরেশন! কলকাতায়! কিন্তু ওদের কেউ দেখতে পায়না! শালা যখন কমান্ড আসে তখন ম্যাপ জানতে পারে কি করে? একেবারে ডিটেলে বলে দেয়।”
“স্যাটেলাইট -” ছিদাম মিনমিন করে বলে।
“এই মেঘ ফুড়ে? গত একবছর তুই এই মেঘ কাটতে দেখেছিস? এই মেঘ কি বৃষ্টি পেটে ধরা পোয়াতি মেঘ নাকি? মেঘে অ্যাসিড পোরা।”
“তাহলে …?”
“গেছে – মাথাটা সম্পূর্ণ গেছে!” ফের বিড়বিড় করে গগন।
“শোন!” – ইউসুফ গলা নামিয়ে বলে, যেন বিষভরা বাতাসেরও কান আছে – “কনসোল চালু হয়ে যাবে আর আধ ঘন্টার মধ্যে। এই কলকাতার মধ্যে আরেকটা কলকাতা আছে! একই ম্যাপ। একই রাস্তা। শুধু সেখানে কোনো যুদ্ধ হয়নি! সেখানে লোকে হেব্বি থাকে! হেব্বি বড়লোক সবাই! কর্পোরেশন, ইউজার – সব সেখানেই থাকে। ওরাই আমাদের মালিক!”
“মানে কি?”
“মানে এ বান্দার মাথা গেছে!”
“মানে এই – যে ওই শহরটা আরেকটা ডাইমেনশনে আছে!”
“ডাইমেনশন কি?”
“প্যারালাল বাস্তব!”
“প্যারালাল কি?”
“মাথা চুদে গেলে যে লাল দেখা যায় তাই’ই প্যারালাল!” – গগন উঠে ভাঙা ব্রিজের কোনা ধরে হাঁটতে আরম্ভ করেছে।
“এই যে শহরটা, এই যে ধ্বংসস্তুপ, এখানে কয়েকটা জায়গায় কতগুলো দরজা তৈরি হয়ে গেছে – কর্পোরেশন তৈরি করেনি – এটা মানুষের তৈরি দরজা না – বুঝলি? সুড়ঙ্গ টাইপের – যুদ্ধের সময়ে ছ্যাঁদা তৈরি হয়ে গিয়েছিল – সেখানে ঢুকে গেলেই তুই অন্য ডাইমেনশনে, অন্য কলকাতায় পৌঁছে যাবি! ওদের কলকাতায়!”
“ডাইমেনশন কি?”
উত্তেজনায় ইউসুফ কাঁপছে – “ওরা ক্ষমতাবান, ওদের টেকনোলজি আছে – তাই আমাদের কন্ট্রোল করতে পারে। ওরা আমাদের দেখতে পায়, আমরা হুব্বা ওদের টিকিটারও টের পাইনা। আমি কি বাল এমনি এমনি এই চাকরি নিয়েছি? আমার এখন মিশন ওই দরজাগুলো, সুড়ঙ্গগুলো খুঁজে বের করা – তারপর পালাবো!”

divider

এক ঘন্টা বাদে ওরা ব্রিজের নিচ দিয়ে – তিরিশ বছর আগে যে রেললাইনে ট্রেন চলতো – তা ধরে হাঁটছে।
“বেশি দূরে যাসনা” – ছিদাম বলে – “ফাইন হয়ে যাবে।”
“আগে ওয়ার্নিং দেয়, তারপর ফাইন – তুই শালা নিয়মপন্থী – কখনো নিয়ম ভাঙিসনি বোঝা যাচ্ছে” – গগন বলে। ও আর ইউসুফ হাসে। ছিদামও হাসে এক লহমা বাদে, ক্যাবলার মত।
“না রে ভাই – আমার খুব ভয়!”
“তোর ভয়? তালে তুই এই লেভেলের প্লেয়ার হলি কি করে? ভয় থাকলে তুই আমাদের সাথে থাকতিসই না। তুই আসলে মানসিকতায় চাকর টাইপের!”
“সে যা বলিস ভাই …।”
হঠাৎ ছিদাম একটা প্রশ্ন করে, বোঝা যাচ্ছে ইউসুফের থিওরিটা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে – “আচ্ছা, তুই যদি ওই সুড়ঙ্গ পেয়ে যাস ওরা তো টের পাবে – ব্লাস্ট করে দেবে তো!”
“পেলেই ঝাঁপ দেবো নাকি? আগে আবিষ্কার করে নেবো। তারপর ঠিক এই সময়টায় ফিরে যাবো জায়গাটায় -।”
“তুই বলছিস এখন ওরা আমাদের নজরে রাখছেনা? ওরা টের পাবেনা? চারিদিকে ড্রোন।”
“শোন! রিস্ক না নিলে মজাটা কোথায়? স্ট্র্যাটেজি করতে হবে। তার আগে জায়গাগুলো আইডেন্টিফাই করতে হবে। সুড়ঙ্গ কোথায় আছে কর্পোরেশনও জানে না! ওরাও খুঁজছে। ওরা একটা দুটো জানে, সেগুলো গার্ড করে রাখে – সেগুলোর কাছে গেলেই সাইরেন-ফাইরেন বেজে হেগেমুতে তল করে দেবে – সব নজর ওই জায়গাগুলোতেই। আর বাকিগুলো জানে শুধু ও্পারের কিছু আন্ডারগ্রাউন্ডের লোক -”
“ওখানেও মাটির তলায় লোক থাকে? তুই যে বললি যুদ্ধ হয়নি, হেভি সুখশান্তি -”
“আহা! এই আন্ডারগ্রাউন্ড মানে মাটির নিচের লোক না -”
এই সময়ে, কিছুটা দূরে, প্রায় মাটি ফুঁড়েই বেরিয়ে এলো একটা ছায়ামূর্তি, ওদের তিনজনের হাত কোমরে অস্ত্রের কাছে চলে গেল রিফ্লেক্সে। এই অস্ত্রে মানুষ মরেনা, হাই ভোল্টেজ শক খেয়ে নির্জীব হয়ে যায় কিছুক্ষণ, ইমিউনিটি লেভেল কমে যায়। তারপর আবার লেভেল পেরোনো বেশ ঝক্কির ব্যাপার। মাস্টার দয়ালু হলে তারাই দায়িত্ব নিয়ে নেয় অনেকটা, আর না হলে মালিক খুঁজতে বেরোতে হয়।
মূর্তিটা হাত তুললো; তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। বুড়োটে লোক একটা, দেখেই বোঝা যায় লেভেল তলানিতে ঠেকে গেছে।
“ব্রাদার্স! তোমাদের মধ্যে বেশি লেভেল কার ভাই!” – লোকটা কিছু না করেই হাঁপাচ্ছে।
“কি দরকার?” – গগন বললো।
“ভাই – লেভেল কমে গেছে – বাঁচা যাচ্ছেনা ভাই!”
তিনজনের হাত অস্ত্র থেকে সরে গেছে।
“আর ঘন্টা খানেক, তারপর আবার অ্যাক্টিভেশন টাইম…।”
“ঘন্টা খানেক নয়। কিছু মিনিট। আপনার সময়জ্ঞান চুদে গেছে।”
“হ্যাঁ ভাই – হতেই পারে – আমি বলছি কি – অ্যাক্টিভেশনের পর আমি তোমাদের মধ্যে যার লেভেল হাই একটু অ্যাটাক করবো? ভাই একটু হেরে যাবি?”
ইউসুফের চাইতেও পাগল, বলা যায় সত্যি পাগল।
“মামার বাড়ি নাকি? হারবো কেন?”
“হেরে যা না রে ভাই! তোর তো লেভেল হাই, একটু কমবে। আর আমি একটু লেভেল পাবো – বেঁচে যাবো ভাই – তোর কম ক্ষতি হবে, আমার বেশি লাভ। ভাই মানুষের উপকার করবি না?”
“পাগলাচোদা! ওসব চেষ্টা কোরো না কাকা বুড়ো বয়সে – চ!”
ওরা ফের ব্রিজের দিকে ফিরতে আরম্ভ করলো। বুড়োটা ধোঁয়া-ধুলোর মধ্যে থমকাচ্ছে, পিছু নিচ্ছে আর বকবক করছে। এক সময়ে হঠাৎ অন্তরীক্ষ কাঁপিয়ে সাইরেন বেজে উঠলো। ওদের মাথার পিছনে যে ধাতব সকেটগুলি তাতে তীক্ষ্ম আলো জ্বলে উঠলো। বুড়োটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়ে, তারপর উঠে পিছন দিকে দৌড় লাগালো, মিলিয়ে গেল ধোঁয়ায় – ওকে পজিশনে পৌঁছোতে হবে।
সাইরেন চলছে। ওরা তিনজন দক্ষিণাপনে পৌঁছে গিয়ে দেখলো আকাশ থেকে নেমে এসেছে তিনখানা পাইপ। সেগুলো মাথার পিছনে সকেটে লাগিয়ে নিলো ওরা, আর শরীরে প্রবেশ করতে লাগলো অক্সিজেন, এনার্জি, নিউরোকেমিকালস আর নানাবিধ মাইক্রোচিপ্‌স। আর ফেরত যেতে লাগলো বর্জ্যপদার্থ আর ফুরিয়ে যাওয়া চিপ্‌স।
“প্লেয়ার্স! অ্যাটেনশন! প্রাইম প্লেইয়িং টাইম শুরু হবে আর পনেরো মিনিটের মধ্যে!”
ওদের চোখে তীক্ষ্ম নীল আলোর বিন্দু জ্বলে উঠলো।

divider

অভিষিক্তা চেয়ারে বসলো। তলপেটের ব্যথাটা ঘুম থেকে ওঠার পর চাগাড় দিয়ে ওঠে; অভ্যেস হয়ে গেছে, তাও ওর বালিকা শরীরটা কেঁপে ওঠে। নাকে ঝাঁঝালো তরল পাইপ দিয়ে ঢুকে বাষ্পে পরিণত হচ্ছে। শরীরের ভেতর যন্ত্র আর মাংসের কথোপকথন শুরু হয়ে যায় নতুন করে, ঘুম থেকে ওঠার পরে।
অভিষিক্তার মা এসে ওকে খাওয়ালো, ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে। চোদ্দ তলার বাড়ির জানালার বাইরে একটা স্পিনার এয়ারহোভারক্রাফট উড়ে যায় কর্পোরেশনের জয়গান করতে করতে।
“মা – জানলা বন্ধ করে দাও – গাড়িগুলো ভালো লাগেনা।”
ওর মা রিমোট দিয়ে জানালার উপর ধূসর একটি আস্তরণ চালু করে দেন, সেটা অনেকটাই আলো কেটে দেয় সকালবেলার। অভিষিক্তার এত আলো ভালো লাগেনা, কলকাতা আলোর শহর হয়ে গেছে। ওর ভালো লাগেনা, ওর অন্যরকম আলো ভালো লাগে।
“সকালে উঠে একটু আলো থাকলে হয় না মা? খালি খালি অন্ধকারে বসে থাকা…।”
“আলো আছে তো ঘরে। গাড়িগুলো বিচ্ছিরি লাগে – জোর করে বিজ্ঞাপণ দ্যাখায়।”
অভিষিক্তা জন্ম থেকেই অসুস্থ। ওর মার অনেকটা টাকা খরচা হয়েছিল সন্তান কাস্টমাইজ করতে। কিন্তু টার্ম্‌স অ্যান্ড কন্ডিশন্‌সেই এরকম ব্যর্থতার সম্ভাবনা উল্লেখ করা ছিল; প্ল্যাটফর্মটা তখন বিটা স্টেজে ছিল। মামলা করার কথা বলেছিলো অনেকে; কিন্তু ওনার মনে হয়েছিল যে এই দূর্বল আধা-অর্গানিক, আধা-সাইবর্গ শিশুটিতে ওনার অতৃপ্তি আছে – এই মনোভাব থেকে কিছু শুরু করাটাই মেনে নিতে কষ্ট হয়। তাছাড়া কর্পোরেশন তো ক্ষতিপূরণ বাবদ চিকিৎসার খরচ দিয়েই যাবে বলেছে।
খাওয়া শেষ হলে বাথরুম করানো, তারপর ধরে ধরে ওর চেয়ারে বসানো।
“দুপুরে কি খাবে মা?”
“এই তো খেলাম” – অভিষিক্তা কনসোল চালু করলো। ঘরের মধ্যেখানে একটা হলোগ্রাম চালু হয়ে গেল। অভিষিক্তার মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন; এখন ঘন্টার পর ঘন্টা চলতে থাকবে। কর্পোরেশন খরচার অনেকটা তুলে নিচ্ছে এইভাবেই। অভিষিক্তা প্রিমিয়াম ইউজার বারো বছর বয়সেই।
“হোস্ট! রেডি?” – অভিষিক্তার কন্ঠে কর্তৃত্বের দাপট।
“রেডি মাস্টার প্যারাসাইট” – ওপার থেকে ছিদাম বললো, তার হলোগ্রাফিক ইমেজ অভিষিক্তার ঘরের মেঝেতে একটা বিশাল প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে। হোস্টের শরীর ঘিরে কর্পোরেট যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কলকাতার পরিসরের ঘনত্ব বাড়তে শুরু করে। অভিষিক্তা প্রিমিয়াম ইউজার – বুট আপ হতে বেশি সময় লাগলো না।
“টাউন লেআউট অ্যাক্টিভেটিং হোস্ট।”
শহরের উপর আরেকটি ভার্চুয়াল শহরের আস্তর পড়তে থাকলো। ছিদাম সেটা শুধু ওর চোখের নীলে দেখতে পাচ্ছে। দক্ষিণাপন একটা ব্যস্ত সৌখিন বাজারে পরিণত হবে এবার। অনেক মানুষের আনাগোনা স্পষ্ট হতে লাগলো – তার মধ্যে ওর স্টেলদ্‌ মিশন শুরু হবে। আজকে ভালো পারফর্ম করতে পারলে লেভেল বাড়বে অনেকটাই। গ্রামের বাড়িতে পাঠানো খাবারের মান বাড়বে আরেকটু।

এই গল্পগুলো লেখা মূলতঃ ‘অপার্থিব’-র প্রেক্ষাপট বোঝাতে, বা ওই জগতটা থেকে যে বিদায় নিতে হবে সেটাকে মেনে নিতে অসুবিধে হওয়ায়। তিনটি গল্পের মধ্যে এইটা প্রথম।

section divider

I will request readers not to republish this work of fiction without attribution, or adapt it into any other derivative form for commercial purpose without the permission of the writer
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License.

All Characters d

Advertisements

4 Replies to “আর্শি নগর”

    1. ধন্যবাদ! এই লেখায় জ্ঞানের কিইবা আছে? স্রেফ নতুন করে কিছু গল্প বলার চেষ্টা 🙂

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s