বিস্ময়ের দৃশ্যাবলী: ‘লা জেটি’ এবং ‘২০০১ এ স্পেস ওডিসি’

আজকের পোস্টটা – আমার আসন্ন সিনেমায় মাথা খাওয়া উপন্যাসটা নিয়ে যথারীতি – দুটি কল্পবিজ্ঞান ছবি নিয়ে। এরকম হওয়া ভালো – কেউ আমাকে জিগ্যেস করলো যে আমার সর্বাধিক প্রিয়তর কোনো ছবি বা উপন্যাস কি? আমি বললাম এবং পরবর্তী প্রশ্ন এলো – প্রভাবটা আছে কীভাবে। আমি বলতে পারলাম না। নিজেই ধন্দে পড়ে গেলাম যে এত প্রিয় – তাহলে প্রভাবটা আছে কীভাবে?
এরকম দুটি ছবি হল ক্রিস মার্কারের ‘লা জেটি’ (১৯৬২) এবং স্ট্যানলি কুব্রিক ও আর্থার সি ক্লার্কের ‘২০০১ এ স্পেস ওডিসি’ (১৯৬৮)। ছবির ভক্ত না হলেও এই দুটি ছবি দেখলে জীবনটা একটু হলেও অজানা কোথাও পালটে যাওয়া উচিত। কিন্তু তার আগে কিঞ্চিত ভিন্ন প্রসঙ্গ।
অন্যান্য জনেরিক ফিকশনের – যেমন হরর, ফ্যান্টাসি, গোয়েন্দা গল্প বা ক্রাইম থ্রিলার, হিস্টরিকাল – চাইতে কল্পবিজ্ঞানের একটা সুক্ষ্ম তফাত আছে। কল্পবিজ্ঞান – অনেকের মতে – লিখতে গেলে বা রসাস্বাদন করতে গেলে – বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার উপর ভিত্তি করে করা উচিত।
যেমন ধরুন প্রফেসর শঙ্কুর গল্প। গিরিডির ল্যাবরেটরিতে যেসব আবিষ্কার হয়ে চলতো সেগুলো একটা সময়ের পর এতই মনগড়া লাগতো যে কেউ বলতেই পারেন যে ব্যাপারটায় বিজ্ঞান আর নেই। তাহলে কি পর্যায়ে থাকবে গল্পগুলি? সায়েন্স ফ্যান্টাসি? তাহলেও তো বিজ্ঞানটা থেকে যাচ্ছে। নেহাতই ফ্যান্টাসি? তাও তো মনে হচ্ছে না।
অনেকেই ভুলে যাবেন হয়তো যে শঙ্কুর শিকড় মূলত দুই জায়গায় আছে – যা ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল কারণ লেখাগুলোই ভুলিয়ে দেয় – সুকুমার রায়ের হেসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়রি আর আর্থার কোনান ডয়েলের প্রফেসর চ্যালেঞ্জরের গল্পে। শঙ্কুর অদ্ভূত আবিষ্কারের এবং ঘটনাবলীর সুত্র এই দুটিতেই।
অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে ‘কল্পবিজ্ঞান’ শব্দটায় ‘বিজ্ঞান’-এর উপস্থিতি হয়তো একটু জঁরটিকে কোনঠাসা করে দেয় অর্থে। শব্দটার ঐতিহাসিকতাও ফের মনে করিয়ে দেওয়া উচিত। ‘সায়েন্স ফিকশন’ এবং ‘কল্পবিজ্ঞান’ শব্দদুটোই জন্মাচ্ছে এমন এক সময়ে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পালাবদল চলছে আমাদের ইতিহাসে। সেই সময়েই বিজ্ঞানের প্রতি যে সম্ভ্রমটা ছিল সেটা এখন আর থাকার মানেও হয়না, এই নিয়ে আগেও লিখছি। ইংরেজিতে আরেকটা শব্দ তৈরি হয়েছে যা অনেকটাই ব্যাপ্ত ও আলগা – স্পেকুলেটিভ ফিকশন – মজার কথা হল আমাদের ভাষায় প্রতিশব্দে ‘কল্প’ অংশটি ওই ‘স্পেকুলেটিভ’-কে অনেক আগেই ধরে ফেলেছিল। বাধ সেধেছে ‘বিজ্ঞান; শব্দটা। আমার মতে ‘কল্পসাহিত্য’ অনেকটা মানানসই প্রতিশব্দ হতে পারে।

১।
কেন এই প্রসঙ্গ?
‘অপার্থিব’ লিখতে লিখতে মনে হয়েছে যে বাংলায় লেখা কল্পবিজ্ঞানের একটা বড় অভাবের জায়গা হচ্ছে সাধারণ মানুষের অনুপস্থিতি। অর্থাৎ কল্পবিজ্ঞানে যারা চরিত্র হন তারা বিশেষ দক্ষতা এবং শিক্ষাদীক্ষার মানুষ – তারা হয় বৈজ্ঞানিক, নয় আবিষ্কর্তা, নয় অ্যাস্ট্রোনট, নয় প্রযুক্তিবিদ, নয় বিশেষজ্ঞ – তারা কেউই সাধারণ মানুষ নন। অথচ কল্পবিজ্ঞানের যদি একটা অবশ্যম্ভাবী প্রবণতা ভাবি গল্পে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজের ভবিষ্যতকে দেখার – তাহলে সেই ভবিষ্যতে এমন অনেক মানুষই থাকবেন যারা সেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বুঝতে পারছেন না, অথচ তাদের জীবনে সেগুলি প্রভাব ফেলছে।
সত্যজিৎ এই ব্যাপারটায় সচেতন ছিলেন। সেজন্য তার গল্পে ভিনগ্রহীর সাথে মোলাকাত হয় কোনো মহাকাশচারীর নয়, একজন সাধারণ মানুষের। তার ‘এলিয়েন’-এর চিত্রনাট্যে নায়ক হল হাবা নামে একটি গ্রামের বালকের। কিন্তু তিনি সব গল্প ভবিষ্যতে ফেলতেন না, কোনো গল্পই ফেলতেন না।
অথচ এই মুহূর্তে আমরা সেই পর্যায়েই আছি যখন তথ্য প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের এমন রদবদল চলছে যা আমরা আলবাত বুঝিনা, কিন্তু যার গভীরে আমরা ঢুকে বসে আছি। কম্পিউটার সবাই বোঝেন না, কিন্তু ফোনে সেই কম্পিউটার চলে এসেছে। আধার কার্ড সবার হবে, কিন্তু রেটিনার আইডেন্টিফিকেশন সবার কাছে বোধগম্য হবে না। এরকম একটা ভবিষ্যতের গল্পে কি প্রধান চরিত্রে থাকতে পারেন তারা – যারা প্রযুক্তি বোঝেন না অথচ প্রযুক্তি যাদের আওতার বাইরে রাখেননি? যে বৃদ্ধ পিতা কম্পিউটার স্পর্শ করে দ্যাখেননি তাকেও সন্তানের সাথে কথা বলতে গেলে স্কাইপ ব্যবহার করতে হচ্ছে – তিনি কিন্তু প্রথম লোকোমোটিভ যিনি দেখেছিলেন তার মত বিস্মিত হন না আর – তিনি ব্যবহার করে চলেন জিনিসটা, কিন্তু কিছুটা বিভ্রান্তি থেকে যায়। এদের ভবিষ্যতের গল্প কে বলবে? যেখানে গল্পকারেরও বিজ্ঞান বোঝার দায় নেই?
এইখানে আবার আমার দুপয়সার থিওরি আছে – তৃতীয় বিশ্বের সমস্ত লেখকের কাছে বিজ্ঞানের ‘জ্ঞান’-এর পুঁজি নাও থাকতে পারে – কিন্তু কল্পনা এবং অভিব্যক্তি থাকতে পারে; থাকতে পারে বলার মত গল্পও। জ্ঞানের ‘পুঁজি’ বললাম স্রেফ লেখকরা হিউম্যানিটিজের ছাত্র বলেই নয়, বিজ্ঞানমনস্কতার অভাব থাকতে পারে বলেও নয় – বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির অনেক তথ্যগত জ্ঞান – যা গবেষণালব্ধ হতে পারে – তা এই লেখকের আয়ত্ত্বে নাও থাকতে পারে। তখন তার প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে বুদ্ধিদীপ্ত অনুমান, অথবা ভাবনার বিমূর্ততা।
কেন এই প্রসঙ্গ – তা আশা করি ফিল্ম দুটির প্রসঙ্গে গেলেই বোঝা যাবে।

This slideshow requires JavaScript.

This slideshow requires JavaScript.

২।

ক্রিস মার্কারের ‘লা জেটি’ মাত্র ২৮ মিনিটের ছবি, এবং প্রায় পুরোটাই স্টিল ছবি দিয়ে বানানো। গল্পটা খুবই ন্যুণতম – তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সভ্যতা প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, পৃথিবী রেডিয়েশনে ছেয়ে গেছে। জীবিত মানুষদের আশ্রয় নিতে হয়েছে মাটির তলায়। তখনই সেই পাতালপুরীতে এক উন্মাদ বৈজ্ঞানিক জীবিত মানুষদের নিয়ে একটি অদ্ভূত এক্সপেরিমেন্ট করতে আরম্ভ করে দিলেন। তিনি মানুষদের পাঠাতে লাগলেন ভিন্ন মাত্রার একটি যাত্রায় – অতীতে ও ভবিষ্যতে – উদ্দেশ্য মানুষের পরিত্রাণের উপায় হদিশ করে নিয়ে আসা। বেশিরভাগ মানুষ এই টাইমট্র্যাভেল সহ্য করতে পারলো না, উন্মাদ হয়ে গেল। শুধু একজনের মধ্যেই সেই রেসিলিয়েন্স পাওয়া গেল যা টিকিয়ে রাখবে মানসিক সুস্থতা। বাকিটা – যারা দ্যাখেননি – দেখে ফেলা উচিত।

This slideshow requires JavaScript.

This slideshow requires JavaScript.

‘লা জেটি’ নিয়ে বৌদ্ধিক, তাত্ত্বিক, এমনকি দার্শনিক লেখা এত হয়েছে যে বলাই যায় যে এই স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিটি সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম চর্চিত একটি ছবি। আমি সময়, স্মৃতি, ইতিহাস, সিনেমা, চেতনা, মৃত্যু, আর্কাইভ নিয়ে সেরকম আলোচনায় যাবো না। আমার বক্তব্য ভিন্ন জায়গায়।
নির্মাতাদের পুঁজি ছিল না। কল্পিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সভ্যতা নির্মাণ করতে পুঁজি লাগে – অর্থ, প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞদের স্কিল ইত্যাদি। অতএব তারা স্থিরচিত্র দিয়ে গল্পটা বলতে আরম্ভ করলেন – এবং এই সীমাবদ্ধতাটা আর সীমাবদ্ধতায় না রেখে ছবিটার দার্শনিক ভিত্তি করে তুললেন। কিন্তু কোন স্থিরচিত্র এই ভবিষ্যত নির্মাণ করবে? ক্যামেরার সামনে যা থাকবে তা’ও তো বানাতে হবে।
ক্রিস মার্কার সেটাও করলেন না বিশেষ। তিনি বাস্তবের চিত্রকেই, সমসময়ের, দু দশক আগে চলা বিশ্বযুদ্ধের ছবিকেই করে তুললেন ভবিষ্যতের ছবি। অতএব মূর্ততার জায়গা ছেড়ে বিমূর্ততার দিকে গেল ছবিটি। যেহেতু ইমেজে গতি নেই – অতএব প্রতিরূপায়ণ অনেকটাই সাজেস্টিভ হয়ে গেল, দর্শকের কল্পনা হয়ে উঠলো সক্রিয় – ইমেজ স্রেফ সাজেস্ট করছে, বাকিটা কল্পনা করে নিচ্ছেন দর্শক। দর্শকের সাথে ইমেজের একটা চুক্তি হয়ে যাচ্ছে – চলুন ধরে নিই এটি এখনকার প্যারিস নয়, ভবিষ্যতের প্যারিস – এরপর আরেকটি হলিউডের প্রোডাকশনের সাথে তফাত এইখানেই যে সেই ছবিটির কাজ আপনার জন্য কল্পনা করে দেওয়া, এই ছবির কাজ আপনার কল্পনা উশকে দেওয়া। কিছু চেনা ইমেজকেই defamiliarize করে দিলে কল্পনার মুক্তি হয়। ঠিক এভাবেই কয়েক বছরের মধ্যে আরেকটি যুগান্তকারী কল্পবিজ্ঞান ছবি এভাবেই ন্যুণতম পুঁজি ও পরিকাঠামোয় বানানো হবে, জঁ-লুক গোদারের ‘আলফাভিল।
এবং সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলি যা করেছে, তাই করে ‘লা জেটি’ – টেকনিক বা প্রকৌশলকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় টেকনোলজি বা প্রযুক্তি ও পুঁজি থেকে, যে কাজটি ‘পথের পাঁচালী’-তে শুরু করেছিলেন সত্যজিৎ, অর্থাৎ অতি সাধারণ মানের যন্ত্র দিয়ে অসাধারণ ইমেজ তৈরি করা, ইমেজের নতুন পরিকল্প তৈরি করা, নতুন ভাবনার ইমেজ তৈরি করা। এমনকি বলা যেতে পারে – যদি হলিউডের বাজেট বা পরিকাঠামো থাকতো মার্কারের, ছবিটা এরকম যুগান্তকারীই হত না।
তৃতীয় বিশ্বের একজন কল্পবিজ্ঞান লেখকও এটা করতে পারেন। এখনকার অ্যাপ্লায়েড বিজ্ঞানের পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেল – যা থেকে ভবিষ্যতের কল্পনা তৈরি হবে – তা যদি তার আয়ত্ত্বে না থাকে, তাহলে তিনি বিশুদ্ধ বিজ্ঞান, অথবা বিজ্ঞানের দার্শনিকতাকে আয়ুধ করে এগিয়ে যেতে পারেন। আবার তা নাও করতে পারেন – কল্পবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক পরিকাঠামো ব্যবহার করে তিনি নতুন ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে পারেন, তার জন্য ‘তথ্যের পুঁজি’ তার না’ই বা লাগলো।
ঠিক উলটো দিকেই আছে স্ট্যানলি কুব্রিক ও আর্থার সি ক্লার্কের ‘২০০১ এ স্পেস ওডিসি’ – অথচ মার্কারের ছবিটির সাথে এই ছবির নিবিড় আত্মীয়তা।

৩।

giphy3
কুব্রিকের কাছে অর্থ, প্রযুক্তি, পুঁজি, পরিকাঠামো, লোকবল – এগুলি কোনোটাই সমস্যা নয়। কিন্তু – উনি যেমন করে থাকেন – পুঁজির কাছে ওনার দর্শন আত্মসমর্পণ করছে না, বরং উনি ঘাড় ধরে পুঁজিকে ব্যবহার করছেন, এমন একটি অভীপ্সায় যা পুঁজির অভিপ্রেত বা কাম্য নয়।
কারণ কুব্রিক ঠিক করেছেন যে উনি দুটি জিনিস করবেন না। হলিউডে ইমেজ স্রেফ গল্প বলে, উনি গল্পটাই বলবেন না সম্পূর্ণভাবে; উনি এমন একটি ছবি তৈরি করবেন যার প্রতিটি ইমেজই প্রায় অভূতপূর্ব, যাকে ‘গল্পের তথ্যে’ পর্যবসিত করা যায়না, বরং যা কল্পনা ও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। ২০০১-এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আছে বহির্জাগতিক কোন এক ইন্টেলিজেন্সের কথা, কিন্তু কুব্রিক তাদের দৃশ্যের আড়ালেই রাখেন – তার বদলে ছবিতে রহস্যজনক এক মোনোলিথ জানায় মহাবিশ্ব আমরাই একমাত্র বুদ্ধিমান আর ক্ষমতাশালী নই। উল্টোদিকে থাকে HAL 9000 নামে মনুষ্যনির্মিত কৃত্রিম ইন্টেলিজেন্স এবং তার এক ব্যাখ্যাহীন নাশকতার গল্প।
কুব্রিকের মতে – বিবর্তনের ফলে ভিনগ্রহীরা হয়ে গেছে “immortal machine entities…beings of pure energy and spirit…with…limitless capabilities and ungraspable intelligence”. ছবির শুরুতে আমরা দেখি প্রাগৈতিহাসিক বাঁদরমানুষদের প্রথম ‘যন্ত্র’ আবিষ্কার, যার পর সেই ভুবনবিখ্যাত ম্যাচ কাটে আমরা হাজির হই স্পেস-এজে। এরপরে প্লট সামান্যই – চাঁদে ও অন্যান্য জায়গায় হঠাৎ একটি আয়তাকার আকৃতি পাওয়া যায় যেগুলি মনে হচ্ছে সিগনাল পাঠাচ্ছে কোথাও। জুপিটারের কাছাকাছি একটি মহাকাশযানে HAL 9000 হঠাৎ নাশকতামূলক কাজকর্ম করতে থাকে।  অতঃপর নভচর ডেভ বাওম্যান বাধ্য হয় HALকে অকেজো করে দিতে, এবং একটি স্পেসপডে জুপিটারের দিকে এগোতে থাকে। সম্মুখীন হয় আরেকটি মোনোলিথের এবং অভাবনীয়, অবর্ণনীয় কিছু অভিজ্ঞতা হয় – একধরণের বিশ্বরূপ দর্শন হয় বলা যায় – এবং এক রহস্যজনক রুপান্তর হয় তার। ছবির শেষে নভচর ডেভ বাওম্যান পরিণত হয় একধরণের মহাজাগতিক ভ্রুণে – সে পৃথিবীতে ফিরে যায়, কিন্তু সে তো আর মানুষ নয় সে অর্থে!
এই প্লট যতটা ধোঁয়াটে লাগলো শুনতে ততটা ধোঁয়াটেই। কুব্রিকের এই ছবির মত ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ খুব কম ছবিই আমাদের সামনে হাজির করতে পারবে। এখানে একজন পরিচালকের কথা বলা যাক – যার প্রথম দিকের ছবির বেশ ভক্ত আমি, কিন্তু যাকে উত্তরোত্তর অসহ্য লাগছে আমার – ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইন্টারস্টেলার’-এ ‘২০০১’-এর সমকক্ষ হওয়ার মুর্খের ঔদ্ধত্য দেখা যায়। ছবিটি টেকনিক বা প্রকৌশলে অত্যন্ত নিম্নমানের, গোটাটাই প্রযুক্তির আড়ম্ভর। এরকম প্রযুক্তির শোকেস জেমস ক্যামেরনও করেন, কিন্তু তিনি অনেক বিনীত, তার জিনিয়াস হওয়ার প্রিটেনশন নেই যা নোলান অর্জন করছেন। ‘২০০১’ যেটা করতেই চায়না সেটা ‘ইন্টারস্টেলার’ করে – সেটা হল গল্পটা বলতে থাকা, গল্পের ব্যাখ্যা করা। ‘২০০১’-এ শেষ আধঘন্টা কি যে হল তা আপনার কাছে চিরদিনের প্রশ্ন হয়ে থেকে যাবে – অথচ ইমেজের অমোঘ আকর্ষণে আপনি ভুলতেও পারবেন না কিছু। ‘২০০১’ ইমেজের বিস্ময় আপনার সামনে উন্মীলিত করে, তার ব্যাখ্যা করে না – আর ‘ইন্টারস্টেলার’ ‘২০০১’-এর অনুকরণ করতে করতে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা করে। যেজন্যে ‘২০০১’-এ সংলাপ ন্যুণতম, আর ‘ইন্টারস্টেলার’ ঘ্যানঘ্যানে সংলাপে ভারাক্রান্ত। ‘২০০১’ হল কবিতা – ‘ইন্টারস্টেলার’ সেই কবিতার ছাত্রপাঠ্য মানেবই, বিস্বাদ গদ্যে লেখা । ‘২০০১’ উন্মাদ ছবি, কবিতার ও বিমূর্ততার ছবি, ‘ইন্টারস্টেলার’-এর অত্যন্ত sane যুক্তিতে নাভিশ্বাস উঠতে থাকে।
ইন্টারনেটে খুঁজলেই ‘২০০১’-এর চিত্রনাট্য পাবেন – পড়লে দেখবেন যে কুব্রিক পাতার পর পাতা সংলাপ, যা গল্পকে স্পষ্ট করে, তা স্রেফ মুছে দিয়েছেন। গদ্য থেকে উনি তৈরি করেছেন ইমেজের কবিতা – তারপর গদ্যসূত্রকে মুছে দিয়েছেন। ‘২০০১’-এর শেষে ডেভ বাওম্যান যখন স্টারচাইল্ড হয়ে যায়, আপনি এক তূরীয় আবেগে, যা হয়তো আধ্যাত্মিক বা মিস্টিক, আক্রান্ত হবেন, অথচ আপনি সেই আবেগের নাম জানেন না, সেই আবেগের কোনো অভিধান নেই; ‘ইন্টারস্টেলার’ আপনাকে এমন একটি ক্লিশে, চেনা, সস্তা মেলোড্রামাটিক আবেগে নিয়ে এসে ফেলবে যে মনে হতে পারে – ও হরি, এই বলার জন্য এত আয়োজন করলি কেন, এত বাজনা-দামামার কি প্রয়োজন ছিল?
হলিউডের পুঁজি, পরিকাঠামো ব্যবহার করে এই সাবভার্সনটাই করেন কুব্রিক – গল্পটা তো বলেনই না চেনা ঢঙে, বরং একগাদা প্রশ্ন তৈরি করে উত্তর দেন না আর – এটা হলিউড কখনোই অনুমোদন করে না, হলিউডের পন্থাই হল ইমেজ যেন খুব অচেনা না হয়ে যায়, গল্পের যেন চেনা টেমপ্লেট থাকে। কুব্রিক সেই পথ নিলেনই না – উনি পুঁজির গল্প না বলে পুঁজিকে ব্যবহার করে অন্য অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করলেন আমাদের। এক মহাকাশ ও মহাকালব্যাপী অভূতপূর্বের সামনে আমাদের হাজির করেন স্ট্যানলি কুব্রিক। প্রথম দর্শনে বিস্ময় হবে – না, অধুনার উন্নতমানের প্রযুক্তি, গ্রাফিক্স আজও সেই বিস্ময়ের সাথে পাল্লা দিতে পারেনি (বরং বিস্ময়কেই ইমেজ থেকে উধাও করে দিচ্ছে) – এরপর যতবার দেখবেন, যখন ইমেজগুলি চেনা হয়ে গেছে, হতে পারে একরকমের আধ্যত্মিকতার সম্মুখীন হবেন, যা শুধু সিনেমাতেই সম্ভব হয়তো।

giphy4

৪।
আমি বলতে পারবো না এই দুটি ছবির প্রভাব আমার প্রথম উপন্যাসে কীভাবে আছে। তবে এটা নিশ্চিত, যে আছে। ভাগ্যিস বলতে পারবো না! অন্তত আমি চাইনা এমন লেখক হতে যিনি লেখার আগেই নিজের লেখা নিয়ে সবকিছু জানেন; আমি চেয়েছিলাম লিখতে লিখতে এমন জায়গায় যেতে যা মহাকাশ বা নতুন একটি গ্রহের মতই আমার কাছে অজানা, যার সবকিছুর ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। আমি চাই শেষ করার পরেও আমার লেখায় অনেক কিছু অস্পষ্ট থাকুক আমার কাছে, পাঠক তার অর্থ করে নিন নিজের মত। আমি এমন রিস্ক নিতে চাই যার নতুনত্ব স্বীকৃত হলেই আমি খুশি, সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও। এতটুকু তৃপ্তি তো থাকবে যে চেষ্টা করেছিলাম!
পদ্ধতি নিয়ে দুকথা বলতে পারি – আমি চেয়েছি মার্কারের ছবির মতন এমন একটা গল্প বলবো যেখানে তথ্য ও জ্ঞানের পুঁজি আমার আর পাঠকের মধ্যে অন্তরায় হয়ে উঠবেনা; আমি চেয়েছি কুব্রিকের ছবির মত ব্যাখ্যা কম করে গল্প বলার। কিন্তু আমি কুব্রিক নই, আর আমার মাধ্যম সাউন্ড-ইমেজ নয়, গদ্য – যা বড় ব্যাখ্যা করে ফেলে – তাই পাঠকই বলবেন আমি নোলান হয়ে গেছি নাকি। তবে এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমার গল্প সিনেমার দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো নয় – ‘অপার্থিব’ সাহিত্য, সাহিত্যই হতে চেয়েছিল। আমি আদতে সিনেমার ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও এটা বলবো যে পর্দায় ‘অপার্থিব’ কি হতে পারে বা পারতো – তা নিয়ে আমার কোনো উৎসাহ নেই। যেভাবে এই গল্প বাংলায় না হয়ে ইংরেজিতে কিরকম হত – তাই নিয়েও আমার কোনো উৎসাহ নেই। খুব একটা নতুন কিছু হত না – এটা অন্তত আমার বিশ্বাস হিসেবে জানিয়ে রাখতে পারি।
আমি চোরাগোপ্তা চুরি করেছি এই দুটি ক্লাসিক ছবি থেকে – কিছু চুরি সূক্ষ্মভাবে ম্যানেজ করেছি, কিছু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যেতে পারি। কিন্তু আমি শিল্পে মৌলিক কিছু তেমন আর করতে চাইনা – আমার অনেক প্রিয় হল সাহিত্যে-শিল্পে ধার করা, ডাকাতি করা, হজম করে পালটে দেওয়া, অন্যের কাজ নিজের করে নেওয়া – আর মার্কার এবং কুব্রিকদের প্রণাম জানানো তাদের ভাবের ঘরে চুরি করে।
‘অপার্থিব-র এই মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারে আসার কথা।
cropped-softcover-trade-book-psd-mockup-aparthibo.png

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s