অধিকৃত শরীর ও অবচেতনের অরণ্য: ‘দ্য থিং’, ‘এলিয়েন’ এবং আশির দশকের আতংক

জন কার্পেন্টারের ‘দ্য থিং’ (১৯৮২) নিয়ে লেখার ইচ্ছে সেই ‘ব্লেড রানার’-এর উপর পোস্টটা শেষ হওয়ার পর থেকেই। লিখতে পারছিলাম না, কারণ একটা ছবির পেটে আরেকটা ছবি, আরো উপন্যাস ঢুকে পড়ছে।
এই ব্লগ অনেকের অদ্ভূত লাগতে পারে – একটা উপন্যাসের ব্লগে এত ছবির কথা কেন? হোক না – উপন্যাসের সম্ভার থেকে যদি ছবির জন্ম হয়, ছবির স্মৃতি থেকেও একটা উপন্যাস হোক না কেন!
খুব কম বাঙালি চলচ্চিত্ররসিকই জন কার্পেন্টারকে চেনেন। কারণ জন কার্পেন্টার গ্রহনযোগ্য পুরস্কার পাননি কোনও, কাজও করেছিলেন এমন একটা কপালপোড়া দশকে – ১৯৮০র দশকে – যখন সারা পৃথিবীতেই ছবির মান নিম্নমুখী। কোনোদিনও বড় স্টুডিওর প্রসাদ পাননি। বা, ‘দ্য থিং’-এ পেয়েছিলেন, কিন্তু ছবিটির বক্স অফিসে ব্যর্থতা সেই সম্ভাবনা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর বাঙালিদের না জানার কারণ আরেকটি – যেটা এই ব্লগের মুখ্য থিম হয়ে উঠছে – জন কার্পেন্টার generic ছবি করতেন।
বাঙালিরা গোদার-ত্রুফো এবং ফরাসী নিউ ওয়েভ ভালোবাসে; কিন্তু অদ্ভূত কান্ড হল – গোদাররা হলিউডের সিস্টেমটি যেমন আদপেই ভালোবাসতেন না – তেমনই ভালোবাসতেন হলিউডের বেশ কিছু ছবি আর তাদের নির্মাতাদের। সেই নির্মাতাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন যারা সস্তা থ্রিলার বানাতেন। সস্তা থ্রিলারের মধ্যে যে রাজনৈতিক-দার্শনিক সম্ভাবনাগুলি থাকে, স্রষ্টার বিশ্ববীক্ষা প্রকাশের উপায় থাকে, সেগুলি গোদার-ত্রুফোরা বুঝতেন, তাদের বাঙালি ভক্তরা বোঝেন না। যেমন এই ভক্তরা বোঝেন না কেন তাদের পুজ্য চলচ্চিত্রকারেরা মূলধারার কিছু সস্তা ছবিকে ভালোবাসেন (বুঝলে তারা দীর্ঘদিন আমাদের মেলোড্রামাকে হেয় করতেন না), তেমন তারা বোঝাতেই পারবেন না কেন ওজুর পছন্দ ছিল জন ফোর্ডের ছবি, বা আব্বাস কিয়ারোস্তামির প্রিয় ছবি ছিল ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ‘দ্য গডফাদার’। গোদাররা পঞ্চাশের দশকে বড় স্টূডিওর উল্টোদিকে থাকা, বক্স অফিসের চোখে মধ্যবর্গীয় হলিউড নির্মাতাদের পছন্দ করতেন – যেমন নিকোলাস রে বা স্যামুয়েল ফুলার – জন কার্পেন্টার ছিলেন তাদের উত্তরসূরী। হরর আর সায়েন্স ফিকশনেই মূলত তার কাজ, কিন্তু সবসময়েই কম বাজেট, ন্যূণতম পরিকাঠামোয় আটকে থাকতে হয়েছে তাকে। এর মধ্যেই ‘এস্কেপ ফ্রম নিউ ইয়র্ক’ বা ‘দে লিভ’-এ তিনি ফিউচারিস্টিক ডিস্টোপিয়ান কল্পবিজ্ঞানের মারফত কিভাবে রাজনৈতিক দ্যোতনার ছবি করা যায় তা দেখিয়েছেন। তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি ‘দ্য ফগ’ এভাবেই একটি মামুলি ভূতের গল্প থেকে হয়ে যায় প্রায় আমেরিকার ধনতান্ত্রিক সমাজের গোড়াপত্তনের সমালোচনা।
কিন্তু প্রসঙ্গ হল ‘দ্য থিং’।

This slideshow requires JavaScript.

‘দ্য থিং’-র সাথে আপাতভাবে ১৯৭৯-এর রিডলি স্কটের ছবি ‘এলিয়েন’-এর আত্মীয়তা আছে। দুটি ছবিতেই কল্পবিজ্ঞানের সাথে যুক্ত হয় হরর। দুটি ছবিতেই চাপা ত্রাস, প্যারানোইয়া দমবন্ধ আকার ধারণ করে, এবং ভালো জনেরিক ছবিতে যা হয় অনেকসময়েই – ইঙ্গিত আসতে থাকে মেটাফর, অ্যালিগরির। যেমন ‘এলিয়েন’-এর প্লট খুব সামান্য। দূরতর গ্যালাক্সির দিকে ধাবমান একটি স্পেসশিপে হঠাৎ অনুপ্রবেশ ঘটে একটি ভয়ংকর এলিয়েনের, যেটি মানুষের শরীরের ভিতর অনুপ্রবেশ করে একসময়ে সেই শরীর ফাটিয়ে বেরিয়ে আসে। এই ‘সংক্রমণ’ ঘটে যখন এই অভিযাত্রীরা একটি গ্রহে ল্যান্ড করেছিলেন অজানা রেডিও সিগন্যাল পেয়ে।
‘এলিয়েন’-এ এই মানুষ ফাটিয়ে দানবের জন্মের গ্রটেস্ক দৃশ্যগুলিতে যে বীভৎসতা, তাতে অদ্ভূত দ্যোতনা জমতে থাকে – মনে হয় যেন পুরুষশরীর থেকেই সিজারিয়ান জন্ম ঘটছে রাক্ষসের সন্তানের। জেন্ডারের প্রচলিত ধারণায় গোলমাল করে দিতে থাকে দৃশ্যগুলি, পৌরুষের ধারণা বিপন্ন করতে থাকে। এটা সমাপতন নয় যে ‘এলিয়েন’-এর মুখ্য চরিত্রে – একমাত্র সার্ভাইভার ও দানবনাশিনী – আছেন একজন নারী (যিনি এরপরের সিকোয়েলে হয়ে উঠবেন প্রায় আদর্শ মাতৃমূর্তি, যার হাতে অস্ত্র পূর্ণতা পায়)। অতএব দুইধরণের মাতৃত্ব, অস্ত্রধারী রক্ষক মাতা আর প্রজননক্ষম রাক্ষস, যুঝতে থাকে। অন্য গ্রহের সন্ধানে মহাকাশ-অভিযান – যা প্রায় ঔপনিবেশিকতার মত – যে সবসময়ে আবিষ্কারের উত্তেজনার দিকে না গিয়ে থমকে যেতে পারে অজানা আতংকের সম্মুখে, সেই ভীতির গল্প বলা হয়। তার সাথে আরো কিছু মাত্রা যুক্ত হয়ে যায়। ‘এলিয়েন’-এর এরপর অনেকগুলি সিকোয়েল হয়েছে, স্কট তার মধ্যে বানালেন কিছু বছর আগে ‘এলিয়েন: প্রমিথিউস’ (এই বছরেই আসছে ‘এলিয়েন:কোভেনেন্ট’)। এই ছবিগুলিতে যেটা বেরিয়ে আসে সেটা হল – এক, এই অজানা আতংক সংক্রমণের মাধ্যমে পৃথিবী অব্দি পৌঁছে যেতে পারে, দুই, অজানার দিকে এই অভিযান উন্মোচিত করতে পারে মানুষের উৎসের ভীতিপ্রদ রহস্য। অতএব ‘এলিয়েন’-এ ঔপনিবেশিক ধনতন্ত্র একইসাথে সভ্যতার পরিসরের সীমানা এবং সভ্যতার সময়ের সীমানার এমন একটি দরজা খুলে দিচ্ছে যা হয়তো বন্ধ থাকলেই ভালো হত।

This slideshow requires JavaScript.

Dr. Blair: You see, what we’re talkin’ about here is an organism that imitates other life-forms, and it imitates ’em perfectly. When this thing attacked our dogs it tried to digest them… absorb them, and in the process shape its own cells to imitate them. This for instance. That’s not dog. It’s imitation. We got to it before it had time to finish.
Vance Norris: Finish what?
Dr. Blair: Finish imitating these dogs.

জন কার্পেন্টারের ছবিতে সেই অজানা আতংকর প্রকৃতি একইরকম – একইভাবে সেই ভয়ংকর ভিনগ্রহী প্রানী মানুষের শরীর অধিগ্রহণ করে নিতে পারে গোপনে, মানুষের শরীর ফাটিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে ঘিনঘিনে রাক্ষস, অধিকৃত মানুষের বা প্রানীর আকার ধারণ করে রাখতে পারে সেই মনস্টার ‘ইমিটেশন’ হিসেবে, যতক্ষণ না পূর্ণ আকার পেয়ে সে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু তফাতটা হল দুটো – প্রথমত, ঘটনাটি মহাকাশে বা কোনো দূরতর গ্রহে ঘটছে না, ঘটছে পৃথিবীতেই; দ্বিতীয়ত, এই ছবিতে রক্ষাকারী নারী নেই কোনো, জীবিত পুরুষচরিত্রগুলি গল্পের শেষে তাদের গরিমা হারায়।
‘এলিয়েন’-এ আমাদের দৃষ্টিই ছিল বহির্মুখী, মহাকাশ থেকে কোনো এক ভয়ংকর আসছে, সেই অজানার দিকে। ‘এলিয়েন’ সে অর্থে বহিরাগত intruder-এর গল্প দিয়ে শুরু।
‘দ্য থিং’-এর দৃষ্টি উল্টোদিকে, অন্তর্মুখী – এবং সেখানেই ছবিটির তুরুপের তাস। অ্যান্টার্টিকায় বরফ ঢাকা একটি অঞ্চল, সেখানে কিছু আধা-মিলিটারি, আধা-বৈজ্ঞানিক বেসক্যাম্প। সেই ধূধূ শ্বেতপ্রান্তরে হঠাৎ বরফে চাপা একটি ভিনগ্রহী স্পেসশিপ উদ্ধার হয়, হয়তো কোটি কোটি বছর আগে এখানে এসে পড়েছিল। কিন্তু মানুষের অনুপ্রবেশ ভাঙিয়ে দেয় সেই যানে আটকে থাকা অজানা প্রানীর শীতঘুম। এইবার সে ঘুম ভেঙে উঠে বাসা বাঁধতে থাকে, একের পর এক, ভাইরাসের মত মানুষের শরীরের ভেতর। অধিকৃত মানুষগুলি যেন পালটে যেতে থাকে, বা তাদের ধ্বংস করে তাদের ‘ইমিটেট’ করতে থাকে অনুপ্রবেশকারী; তারপর একসময়ে অধিকৃত মানুষের কোষ-রক্ত-মাংস-মজ্জায় পুষ্ট হয়ে ফেটে বেরিয়ে আসে সেই ভয়ংকর।
‘দ্য থিং’ – সেই অর্থে – সংক্রমণের গল্প বলে, অধিগ্রহণের – শরীরের মধ্যেই অজানার অনুপ্রবেশের। বলা যেতে পারে যে ‘এলিয়েন’-এও এটা হচ্ছিলো, কিন্তু কার্পেন্টারের সুক্ষ্ম রাজনৈতিকতা এখানেই। একটি বদ্ধ সীমাবদ্ধ পরিবেশে – যেখানে একের পর এক মানুষে সংক্রমণ ঘটছে শয়তানের – সেখানে গল্পটা হয়ে যায় বাকি মানুষদের মধ্যে সন্দেহের, অবিশ্বাসের, ক্ষমতার টানাপোড়েনের – সেটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। এই ছবিতে যে প্যারানোইয়া ও চেনা মানুষের মধ্যে অপরের ভয় – তাতে অনেকে ১৯৫০-র ম্যাককার্থি যুগের আমেরিকায় যে সমাজে লুক্কায়িত কম্যুনিস্টের ডাইনি-খোঁজ – তার দ্যোতনা পেয়েছেন। ছবিতে এক সময়ে শয়তানের বিরুদ্ধে বীরদের যূথবদ্ধতার চাইতে এই পরস্পরের বিরুদ্ধে সন্দেহের গল্পটা হয়ে যায় দমবন্ধ করা। এই ছবির মুক্তির কিছু বছরের মধ্যেই পৃথিবীতে AIDS মহামারী ফেটে পড়বে। সেই সময়ে মানুষের প্রতি – বিশেষ করে প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের প্রতি, বা রক্ষণশীল যৌনতার লোকেদের অন্য যৌনস্বভাবের মানুষের প্রতি যে সন্দেহের মহামারী তৈরি হয়েছিল – তার প্রায় অবিকল ছবি তৈরি করতে থাকে ‘দ্য থিং’।

This slideshow requires JavaScript.

আবার গল্পের কাঠামোটা বেশ চেনাও। ‘দ্য থিং’ জন ডব্লিউ ক্যাম্পবেল জুনিয়রের ১৯৩৮ সালে লেখা ‘হু গোজ দেয়ার’-এর অবলম্বণে তৈরি (এর আগে ১৯৫১ সালে হাওয়ার্ড হক্‌স একটি ছবি করেছিলেন একই গল্প অবলম্বণ করে)। আর ১৯৩৯ সালে আগাথা ক্রিস্টির ‘অ্যান্ড দেন দেয়ার ওয়াজ নান’ (আগে নাম ছিল ‘টেন লিটল নিগারস’) উপন্যাসেও এরকম একটি সিচ্যুয়েশন পাওয়া যায়। একটি দ্বীপে – যেখান থেকে সভ্যতা একটু দূরে – দশজনকে ডেকে আনা হয় এবং জানানো হয় যে তারা তাদের অতীতে কোনো কুকর্মের হেতু মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হল। সত্যিই এক এক করে মানুষ খুন হতে থাকে – ছেলেবেলার একটি ‘হারাধনের দশটি ছেলে’ জাতীয় ছড়ার আদলে। তখন যারা জীবিত তারা বোঝে যে কেউ একজন আছেন তাদের মধ্যেই যে খুনগুলি করছে। খুন চলতেই থাকে, আর যেহেতু গল্পে কোনো গোয়েন্দা নেই বাড়তে থাকে সন্দেহ আর প্যারানোইয়া। ‘দ্য থিং’-এ হত্যাকারী অচেনা নয় – কিন্তু আখেরে ব্যাপারটা একইরকম। কোন অচেনা এখন কার শরীরে বাসা বেঁধেছে? এই অবস্থা হচ্ছে কোন পাপের ফলে? অভিযান, আবিষ্কার এবং কৌতুহলের সীমা পেরিয়ে গিয়েছিল মানুষ? একটি দৃশ্য আছে যেখানে রক্ত দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে সবাই ‘পরিষ্কার’, ‘দূষিত’ হলে কোয়ারান্টাইন্ড হতে হবে – সেই দৃশ্যের মত হাড় হিম করা দৃশ্য খুব কমই দেখেছি – ম্যাককার্থিজম নয়, ফ্যাসিজমের স্মৃতি উদ্রেক করে দৃশ্যটি।

This slideshow requires JavaScript.

‘দ্য থিং’ এবং ‘এলিয়েন’-এর আতংক আরেকটি ছবিতে প্রতিভাত হয়েছিল – যদিও সেই ছবিটি এত ভালো তো নয়ই, কল্পবিজ্ঞান-ও হিসেবেও ভালো নয়, তাতে ভিনগ্রহী থাকলেও। আমার যেটা মজা লেগেছিল সেটা এই যে ছবিটি শুরু হয়েছিল ‘র‍্যাম্বো’, ‘কমান্ডো’ জাতীয় দক্ষিণপন্থী রেগন-মার্কা প্রেমিস থেকে – তৃতীয় বিশ্বের জঙ্গল-রাজত্বে গিয়ে মার্কিন পুরুষপরাক্রমীরা বেজায় মারামারি করে গোপন যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসবে। ছবির নায়ক ৮০-র দশকের মাংসপেশী চূড়ামনি আর্নল্ড সোয়ারজেনেজার, সাথে একইরকম একাধিক ম্যাচো সহযোদ্ধা এবং দূর্ধর্ষ অস্ত্রের ভান্ডার। আমরা জানি যে এই সমস্ত নিম্নমানের ছবিগুলি আসলে ভিয়েতনামে আমেরিকার চুন-কালিময় পরাজয়ের ক্ষতর উপর উগ্রজাতীয়তাবাদী ফ্যান্টাসির পুলটিস। ১৯৮৭-র ‘প্রিডেটর’-এ এরকম একটি অভিযানও ঘটে। সেখানে অনায়াসে জয়ী হয়ে যায় তারা ছবির আধ ঘন্টার মধ্যে, কিন্তু তারপর এই বিজয়ী মার্কিন বীরেরা বোঝে যে এই ট্রপিকাল জঙ্গলে তৃতীয় বিশ্বের শত্রুপক্ষের চাইতেও ভয়ংকর কিছু একটা আছে। মজাটা তারপর  আরম্ভ হয়, ছবিটির মানও চড়তে থাকে – কি এই অজানা আতংক? প্রায় অদৃশ্য এবং ভয়ংকর? মাঝে মাঝেই সেই পিশাচের পয়েন্ট-অফ-ভিউ থেকে দেখতে থাকি জঙ্গলে দিশেহারা নায়কদের; সেই দৃষ্টি তাপমান দেখতে পায়, আমরা বুঝি এই দৃষ্টি উন্নত ভিনগ্রহীর – হয়তো এই গ্রহে এসে ফেরত যেতে পারছেনা। আতংকে সেই অ্যাকশন হিরোগুলি প্রায় নার্ভের ধ্বংশাবশেষ হতে হতে মরতে থাকে যতক্ষণ না শেষ সার্ভাইবার এবং বিজয়ী হিসেবে টিকে যান আর্নল্ড – কিন্তু ততক্ষণে আতংক তাকেও গ্রাস করে ফেলেছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন সৈনিকদের প্রধান বিপক্ষ ছিল terrain – অর্থাৎ ঘন জঙ্গল, যেখানে আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে শত্রুপক্ষ, যাদের কাছে ওই জঙ্গল প্রায় জন্মভূমির মত চেনা। এই আতংক নিয়েই তো তৈরি হয়েছিল – ‘এলিয়েন’-এর বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত – ‘অ্যাপোক্যালিপ্স নাও’ (১৯৭৯), জোসেফ কনরাডের ‘হার্ট অফ ডার্কনেস’ অবলম্বণে। সেই ছবি স্পেকুলেটিভ ফিকশন নয় – কিন্তু সেখানেও – উপন্যাসে এবং ছবিতে – ঔপনিবেশিক আবিষ্কার, মার্কেন্টাইল ক্যাপিটালিজম এবং আধুনিক সামরিক দাপট একাকার হয়ে যায়, পর্যবসিত হয় দূঃস্বপ্নে। নায়কের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে থাকে পাশ্চাত্ত্য সভ্যতার অপর হয়ে যাওয়া কর্নেল কুর্তজ – যে একসময়ে ছিল পাশ্চাত্ত্যেরই প্রতিভূ। সভ্যতার অপরের দিকে যাত্রা যেন হয়ে ওঠে সভ্য মানুষের নিজের অবদমিত অন্ধকারের হৃদয়ের গহনে যাত্রা; যেন আধুনিক মানুষ ফিরে গেছে প্রাগৈতিহাসিকে – যেখানে সভ্য মানুষ হয় বধ্য, নয় উলটো হয়ে যায় – আদিম অসভ্য ট্রাইবাল। নায়কের হাতে হত হওয়ার সময়ে কুর্তজ ফিসফিস করেছিল – “The horror! The horror!” কিসের বিভীষিকা জানায়নি। নিজের আদ্যন্ত পালটে যাওয়ার?
অর্থাৎ এই পরিসর খানিকটা আমাদের প্রফেসর শঙ্কুর ‘একশৃঙ্গ অভিযান’-এর মত হয়ে যায় – আধুনিক মানুষ এমন এক পরিসরে গিয়ে হাজির হয় যেখানে যেন নিজের অন্তর্গত অন্ধকার, পোষা ফ্যান্টাসি হ্যালুসিনেটরি আকার ধারণ করে মুখের উপর তাকিয়ে থাকে, উদ্রেক করে অজানার আতংক। ‘প্রিডেটর’-এ সেই প্রেক্ষিতের আতংকই যেন ফিরে আসে, প্রাগৈতিহাসিকের সামনে পড়ে যায় আধুনিকতম সামরিক পেশাদারেরা – যেন প্রিডেটর আর কিছুই না – সেই অরণ্যের দেবতা, আবার হয়তো সৈনিকদের কালেক্টিভ মনের মধ্যে অবদমিত আতংকের মূর্তিও। সেই অরণ্যে নিজেকে ছাড়া আর কারুর সম্মুখীন হওয়ার নেই। যেখানে নিজের মধ্যে অজানা অপরের সংক্রমণের ভয় …

এই দেখুন – আজ ‘অপার্থিব’ নিয়ে একগাদা কথা বলে ফেললাম!

cropped-softcover-trade-book-psd-mockup-aparthibo.png

Advertisements

6 Replies to “অধিকৃত শরীর ও অবচেতনের অরণ্য: ‘দ্য থিং’, ‘এলিয়েন’ এবং আশির দশকের আতংক”

  1. এলিয়েন কখনো-সখনো নানা ধরনের পার্থিব ‘অপর’-এর প্রতীক। আবার কখনও তা নয়। বিশেষত, লক্ষ করে দেখবেন, আসিমভ ( বা স্টিফেন ব্যাক্সটারের মতো হার্ড এস এএফ লেখকেরা) খুব কম সময়তেই ভিনগ্রহীদের প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছেন। বরং, সত্যি সত্যিই একটা উন্নত সভ্যতা কত বিচিত্রভাবে বিকশিত হতে পারে, এলিয়েন কালচার বর্ণনা করার সময়, সেইটেই তাঁর প্রধান বিবেচ্য।
    ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, জঁর হিসাবে কল্পবিজ্ঞান যেন কেবল প্রতীক নির্মাণেই সীমাবদ্ধ না থাকে। কল্পবিজ্ঞান তো শুধু ফিউচারিস্টিক মেট্যাফরিকাল ফেবল নয়। অনোখা সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে হলে মেটাফরের অতিরিক্ত কিছু হয়ে উঠতে হবে তাকে। এলিয়েন কিংবা দ্য থিং প্রসঙ্গে আপনার ব্যাখ্যা অনস্বীকার্য। তবে, কল্পবিজ্ঞান জঁরের থেকে আমার চাহিদা আরও বেশি কিছু, এইটুকুই বলার চেষ্টা করলাম মাত্র।
    আর, প্রমিথিউসের ধর্মীয় আন্ডারটোন সম্পর্কে কখনও অন্য কোনো লেখায় বলবেন আশা করি। এই ছবির ক্রিশ্চিয়ানিটি বা ২০০১-এর বিমূর্ত ধার্মিকতা, বা দ্য রেস্টরেন্ট @এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড-এর অধার্মিকতা বোধহয় আলাদা একটা ব্লগপোস্টের দাবি রাখে।

    Liked by 1 person

    1. একদম ঠিক। সবসময়ে যে কল্পবিজ্ঞান প্রতীকী হতেই হবে তার কোনো মানে নেই। তবে কল্পনারও তো ইতিহাস থাকে, আমি এই ছবির কল্পনাগুলোর ঐতিহাসিকতা খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। শ্রেষ্ঠতর কাজে প্রতীকীর উর্দ্ধে কিছু একটা থাকতেই হবে যা আরো নিবিড় এবং অসমাপ্ত পাঠ দাবী করবে। সেই দিক দিয়ে এই ছবি দুটি শ্রেষ্ঠতরর পর্যায়ে পড়েনা, যেমন পড়ে ‘ব্লেড রানার’ বা ‘২০০১’। কিছু ভাবনা উস্কে দিলেন, পরের পোস্টে আরো বিশদে লিখবো।
      ‘প্রমিথিউস’ বা ‘২০০১’-এ ধার্মিকতা বলবো না আধ্যাত্মিকতা? এই ব্যাপারে আমি খুব ভালো পারবো না লিখতে। অনুরোধ করবো আপনারা লিখুন, কিছুটা হলেও। আমি খুব বিশদে পড়িনি এই সাহিত্য, আপনাদের কাছে শিখতে পারলে এই ব্লগ লিখে লাভ হবে।

      Like

  2. কাল রাতে এলিয়েন দেখলাম। মানে সত্যি সত্যি নয়, ছবিটা দেখলাম। দু-একটা ব্যাপার চোখে পরল। প্রথমত প্রমেথিউস বা অন্যান্য ছবির কথা যদি মাথায় না রাখি, এলিয়েন-এ কিন্তু কোন সাল তারিখের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ এই ঘটনা ভবিষ্যতের হতে পারে, আগের শতাব্দীর হতে পারে আবার ১৯৭৯-এরও হতে পারে। শেষেরটা হলে কিছু ইন্টারেস্টিং সম্ভাবনা ভাবা যেতে পারে। অর্থাৎ ৭০-এর দশক যখন নিজেকে প্রায় গুটিয়ে নিয়েছে এবং গোটা দেশ যখন বসে আছে সানন্দে রেগ্যানকে গ্রহণ করবে বলে, ইতিমধ্যেই পুঁজিবাদী সংস্থার ঔপনিবেশিক প্রবণতা তাকে নিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে শয় শয় আলোকবর্ষ দুরে পুঁজি, সম্পদ বা অস্ত্রের সন্ধানে। ভিয়েতনামের সেটব্যাকের পর তারা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে আগামীর সংঘর্ষের জন্য; লাতিন আমেরিকা, ইরাক, ইরান, আফগানিস্থান, সিরিয়া, গাজা, লম্বা তালিকা। এবং পরিচালকের এই অতি আধুনিকতার কল্পনায় জাতিগত বা শ্রেণিগত বিবাদের ইঙ্গিত স্পষ্ট। যানের একমাত্র কৃষ্ণকায় ব্যক্তি সবথেকে বেশি কায়িক শ্রমের দায়িত্বে এবং অর্থনৈতিকভাবে শোষিত। তার অধিকারের দাবি অবধারিতভাবে চাপা পরে যায় শ্বেতাঙ্গদের আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতির গুরুগম্ভির আলোচনায়।

    Like

  3. amar kichu chatro sulov koutuhol ache. jehetu cinemar student noi abar cinema banate chai tai aro beshi kore prosno gulo mone ashe. Bangla font e lekha ta ektu koshtokor amr pokhe, tai english horofei bangla likhte hoche. Jai hok, mul koutuhol ebong confusion ja ja niye ta prosner akare likhte cheshta kori. Jetuku ja mone holo ta holo je imperialist country er almighty vabmurti te jakhon e aghat legeche kalponik rupkathar ashor sajiye tara manushke akdhoroner escapist peace dite cheyeche. e.g commando er katha jemon bola hoyeche ekhane, abar Arup ratan Dar ekti article e James Bond character er abirvab o khanikta khoter opor prolep dhormi escapist mone holo. Whereas Predator er byakha te mone holo thik counter position e boshe ache cinema ta, ja kina the other side of the coin k metaphorically show koreche. Ei jaygay dariye Amitabh Bachan er 70s er escapist cinema gulo ke o ki commando,rambo ba james bond er gotre fela jay ja manush er modhye akta fantasy toiri kore ashol somosya theke dure soriye rakhche? r tai jodi hoy tahole bishoyta amon je history te eta akta recurring pattern ?

    Like

    1. kishorrahasya – প্রশ্নটার জন্য ধন্যবাদ। এই ব্লগের শেষ ছোটগল্পটা লিখতে ব্যস্ত, তাই পরে গুছিয়ে উত্তর দেবো – এতটা বলা যাক যে মেনস্ট্রিম কল্পনাগুলির মধ্যে একধরণের বৈপরীত্য কাজ করে – বচ্চনের পার্সোনাটা অত সহজে র‍্যাম্বো বা বন্ডের গোত্রে ফেলা যায় না, অনেক বেশি জটিল। বন্ড সম্পূর্ণ ইম্পিরিয়ালিস্ট-ক্যাপিটালিস্ট ফ্যান্টাসি; র‍্যাম্বো শুরু হয়েছিল ভিয়েতনাম প্রজন্মের সৈনিকদের নিউরোসিস থেকে কিন্তু দ্বিতীয় ছবি থেকেই উগ্র-জাতীয়তাবাদী প্রোপাগান্ডায় পর্যবসিত হয়, অর্থাৎ আমেরিকার প্রতিটি সামরিক চুনকালি ডিনাই করে জয়ের গল্প বলতে থাকে। কিন্তু ‘দীওয়ার’ বা ‘শোলে’ অত সহজ হিসাবের নয় – ‘দীওয়ার’ তো নয়ই। আমার কাছে ‘দীওয়ার’ অত্যন্ত জটিল একটি ছবি – কিন্তু কেন তা বোঝাতে অনেক কথা বলতে হয়। আপাতত এইটা বলা যাক যে গতানুগতিক রিভেঞ্জ-ফ্যান্টাসিতে যা হয় এই ছবিতে তা হয়না – বাবাকে কালিমালিপ্ত যারা করেছিল তাদের উপর প্রতিশোধ নিতে পারেনা বিজয়, কোনোদিন তাদের শনাক্তই করতে পারেনা। এই রিস্কটা মূলধারার ফ্যান্টাসির কাছে খুব বড় রিস্ক যেটা ‘দীওয়ার’ নিয়েছিল।

      Like

  4. hya, deewar amaro mone hoyeche besh jotil. sei somoykar commercial chobir pattern mathay rakhle amar personally mone hoy sei somoykar hindi commercial chobi akhonkar commercial theke onek unnotochilo, akhon je dhoroner artificial somosya er fantasy toiri kora hoche tar theke onekangshei vinno gotrer. Jai hok, asha kori pore e niye bisode alochonarsujog pabo. Dhonyobaad. shesh golpo ta porlam, darun. Boi ti beronor opekhay achi.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s