বাংলায় গোয়েন্দা-হরর-কল্প-ফ্যান্টাসি: অহৈতুকী সাহিত্য?

১।

‘কল্পবিশ্ব’ নামে একটি স্পেকুলেটিভ ফিকশনের ওয়েব-ম্যাগাজীনের সংশ্লিষ্ট একটি ক্লোজড গ্রুপ আছে ফেসবুকে। সেখানে জনৈক সমালোচক তার বক্তব্যের শেষে বলেছেন –

“তবে এটা স্বীকার করি-কল্প-বিশ্ব তে, কল্প-বিজ্ঞান কে শিশু সাহিত্য থেকে উন্নত করার একটা প্রবল প্রচেষ্টা আছে … চালাচ্ছেন এক ওয়েবজিন, সেটাও ফ্রি এর কন্টেণ্ট এ – লেখকরাও নতুন, গল্পও সেরকম আহামরি নয়, বিষয় প্রাপ্তমনষ্ক (প্রাপ্তবয়ষ্ক? একটা গল্পে তো রীতিমত অ্যাডাল্ট কন্টেন্ট দেখলাম) – এত অড নিয়ে কতদিন টানবেন?”

সমালোচক বেনামে লিখেছেন, তাই নাম করার মানে হয়না। কিন্তু এই উদ্ধৃতি দিয়েই শুরু করা যায়।

পশ্চিম বঙ্গের বাংলা সাহিত্যে generic fiction-কে কি আদৌ সিরিয়াস সাহিত্য মনে করেন লেখক বা পাঠকরা? এই সাহিত্যের নিবিষ্ট পাঠকরা কি বাংলা সাহিত্য থেকে কিছু প্রত্যাশা করেন আর? তাদের কি অন্য ভাষায় সাহিত্যের তুলনায় বাংলা ভাষায় generic fiction-কে বালখিল্য লাগে? নাকি আমাদের ভাষায় এই ফিকশনের লেখকরা এই লেখাকে বালখিল্যতার পর্যায়ে রেখে দিয়েছেন? বাংলা ভাষায় লেখা এই ধরণের সাহিত্যে কি কোনো বিবর্তন ঘটেছে? সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তা পাল্টেছে কি সচেতনভাবে? বাংলা ভাষায় উল্লেখযোগ্য generic fiction কি বেমালুম বাতাসে মিলিয়ে গেছে – পড়ে আছে যা তা নেহাতই থাকতে হয় বলে থাকা? বাংলা ভাষায় সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে কি এইধরণের সাহিত্যকে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয়, হবে? সত্যজিৎ-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে generic fiction-এর ইতিহাস কি নতুন কিছু দিয়েছে? না দিয়ে থাকলে দেয়নি কেন?

এই দেখুন – আমি generic fiction শব্দটার বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পেলাম না (কেউ বাংলা করে দিলে উপকৃত হবো)। Generic – অর্থাৎ বিভিন্ন জঁর (genre) সংক্রান্ত। এতে এটাই বোধহয় প্রমাণ হয় যে আমরা এই ধরণের সাহিত্যকে – ডিটেকটিভ উপন্যাস, কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস, হরর (অর্থাৎ শুধুই ভুতের গল্প নয়) ইত্যাদিকে – সেভাবে সিরিয়াসলি নিই না – আমাদের কাছে চালু কোনো প্রতিশব্দ নেই (একটি অচেনা-দূরুহ শব্দ হাজির করলে আমার বক্তব্যই প্রমাণিত হবে)। তা দিয়ে সিরিয়াস কিছু করা যায় বলে, স্রেফ টানটান কুশলী গল্প বলা ছাড়া এগুলির দ্বারা আর কিছু হয় বলে বোধহয় আমরা মনে করি না। নিশ্চয়ই অনেক পাঠক মনে করেন যে আরো অনেক কিছু হয়, কিন্তু লেখকরা কম মনে করেন। আজ যদি কোনো লেখক মনে করেন যে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে তিনি রাজনৈতিক কিছু লিখবেন, তাহলে তিনি কল্পবিজ্ঞান লিখবেন না; কেউ যদি ভাবেন যে অস্তিত্ববাদী একটি চরিত্রায়ণ নিয়ে বিস্তারিত কিছু লিখবেন, তিনি গোয়েন্দা গল্পের সিরিজ লেখার কথা ভাববেন না; অতীত এবং ইতিহাস নিয়ে ভাবতে গিয়ে হরর ফিকশন লিখবেন না কেউ। প্রাপ্তমনস্ক কিছু করার ক্ষেত্রে এই গোত্রগুলি (আমি genre-র বাংলা করলাম, তৃপ্তি পেলাম না করে) যথাযথ নয় – তিনি ভাববেন হয়তো। নয়তো কেন এখনকার বাংলা সাহিত্যে ভরপুর জনেরিক স্রোত নেই, এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। অথচ চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগে দেখুন – কম বেশি সব লেখকই – বিভূতিভূষণ থেকে আরম্ভ করে সমরেশ বসু – নিয়মিত জনেরিক ফিকশন লিখে গেছেন।

হয়তো তখন – টেলিভিশনের আগে – জনপ্রিয় সাহিত্যই বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল, তাই (দুতিন সপ্তাহে একবার ছবি দেখতে যাওয়াটা ছেড়ে দিলাম)। কিন্তু সেক্ষেত্রেও প্রশ্নটা আসে – তারা যখন লিখতেন এরকম গল্প – রোজগারের উদ্দেশ্যে লিখতেন কি? শুধুই বিনোদনের উদ্দেশ্যে লিখতেন? জনেরিক ফিকশনের মাধ্যমে সিরিয়াস প্রাপ্তবয়স্ক সাহিত্যচর্চা করার কথা তারা ভেবেছেন?

যেমন – সত্যজিৎ রায় ভাবেননি। এটা বোঝাই যায় যে শঙ্কু-ফেলুদা লেখা তার কাছে কিশোর-সাহিত্য করাই থেকে গেছে। তিনি এই কাজটা সিরিয়াসলিই করতেন; কিন্তু কখনোই তার ছবির মত অভিব্যক্তির মাধ্যম, নিরীক্ষার মাধ্যম ভাবতেন না। পরের দিকে ফেলুদা লেখা তার কাছে বিড়ম্বনা হয়ে গিয়েছিল, কারণ নিজের আরোপ করা গন্ডীই নিজের মাথায় আসা অনেক প্লটকে নাকচ করছিলো – তিনি নিজেই জানিয়েছেন।

আমার ‘অপার্থিব’ লেখার পেছনে যেমন অনেক ইতিবাচক কারণ আছে, নেতিবাচক কারণও আছে। সামান্য একধরণের বিতৃষ্ণা থেকেও এই গল্প লেখা। আমার মাথায় যে প্লট, চিন্তাগুলি আসে সেগুলি বিভিন্ন জঁর কেন্দ্র করেই আসে – অথচ মনে হয় এই ভাবনার কোনো কৌলিন্য নেই, অথচ তথাকথিত ‘সামাজিক’ উপন্যাস আমার সীমাবদ্ধ লাগে নানা কারণে। অর্থাৎ আমি এমন কিছু লিখতে চাইনা যা পুরস্কার পাওয়া বা পাওয়ার যোগ্য বাংলা সাহিত্যের মত পড়তে লাগে, যা আমাকে ‘কথাশিল্পী’, ‘জীবনের কথাকার’, ‘সমাজসচেতন লেখক’ জাতীয় অভিধা দেয়। এই অভিধাগুলি খারাপ তা আমি বলছিনা, এগুলি কেমন যেন নিরাপদ বা ভোঁতা হয়ে গেছে মনে হয়, অথবা আমার বিতৃষ্ণাটা এখনও আমি বুঝিয়ে উঠতে পারছি না।

ঠিক যেমন ফিল্ম সোসাইটির অগ্রজরা কোনোদিনও ধ্রুপদী হলিউডকে বোঝার চেষ্টা করেননি, হিচকককে তাদের ভালো বলতে হয় কারণ গোদার-ত্রুফোরা বলে দিয়েছেন বলে, সের্জিও লিওনে কেন উচ্চমানের শিল্পী তা তারা বোঝার চেষ্টা করেন না, তারান্তিনো যে ভাবনাচিন্তা উদ্রেক করতে পারেন বিশ্বাস করেন না, জন কার্পেন্টারকে চেনেনই না – সেভাবেই বাংলায় এই ধরণের জনপ্রিয় সাহিত্যকে বিনোদনধর্মী ছেলেমানুষীর ঘেরাটোপে সীমাবদ্ধ রাখাটা আমার মনে হয় একটি জাতির ভিত্তিহীন উন্নাসিকতা, অথবা এখানেই তার আধুনিকতার ক্রাইসিস। এই গল্পগুলি যে বেশিরভাগই ছেলেদের জন্য লেখা হয়, সেই পুংলিঙ্গকেন্দ্রিকতার কথা তো বাদই রাখলাম।

আমি তাই লেখার কৌলিন্য থেকে মুক্ত হতে চাইছি, সেই জন্যই কনটেমপ্লেটিভ মুহূর্তে আমার উপন্যাসে হঠাৎ বন্দুক-বিস্ফোরণ-স্যাবোটাজ জাতীয় উপাদান এসে হাজির হবে, উপন্যাস ক্ষণিকের জন্য থ্রিলার হয়ে যেতে চাইবে। আমি ‘অগভীরতা’-র ধ্বজাধারী হতে চাইনা একদমই, বরং উল্টোটাই বলতে চাই। বলতে চাই যে জনেরিক বিনোদনধর্মীতা থাকলেই যে লেখা অগভীর হবে এই ধারণাটা উন্নাসিক; আর যিনি অগভীরভাবে বিনোদন লেখেন তিনিও খুদে লেখক হয়েই থাকতে চান। আমার বিনোদনধর্মীতা বা কিশোরপাঠ্যতার প্রতি কোনো অভিযোগ নেই। বরং উল্টোটাই – যদি আমি এরকম লেখালেখি চালিয়ে যেতে পারি তাহলে আমার সবচাইতে অ্যাম্বিশাস লেখাটি হবে ছোটদের জন্য একটি উপন্যাসই। আমার মতে – ‘ছোটদের’ বা ‘বিনোদনধর্মী’ এই দুই রকমের তকমা আসলে ছোটদেরই অপমান করে আর বিনোদনের শৈল্পিক সম্ভাবনাগুলিও খতিয়ে দ্যাখে না।

আপনি প্রবল রাজনৈতিক একজন নাট্যশিল্পীকে বলতে পারবেন না যে বিনোদনের মাত্রা চড়লে তার রাজনীতির ধার কমে যাবে। আর ‘ছোটদের’ বলে কতগুলি লক্ষ্মণরেখা টানা মানে পাঠকদের উপর সবসময়েই ছোটদের বড়দের চোখ দিয়ে দ্যাখার অভ্যেস চাপিয়ে দেওয়া। এই দৃষ্টি সর্বদাই প্রাপ্তবয়স্কদের নৈতিকতার এবং সার্ভেলেন্সের দৃষ্টি। ছোটদের জন্য লেখা সহজ হতে হবে এটা বলা মানে ছোটদের ভাবনার জগতটাকে অগভীর ও সরল ভাবা। এর চেয়ে বড় চোখে ঠুলি পরা কোনো জাতি করেনি। এটা বলা মানে সুকুমার রায়ের ভাষাকে সরল ভাবা, অবনীন্দ্রনাথকে ঠিক ছোটদের লেখকের যোগ্য না ভাবা, সত্যজিতের ছোটগল্পে যে তার ছবির বিপ্রতীপে একটি জটিল, অন্ধকার জীবনবোধ ব্যক্ত হয় তা অস্বীকার করা, মতি নন্দীর ‘স্ট্রাইকার’, ‘স্টপার’, ‘কোনি’কে নেহাতই স্পোর্ট ফিকশন ভাবা, শৈলেন ঘোষের কোনো মূল্যায়ণ না করা।

ছোটদের জন্য লেখা কঠিন, কুশলী এক্সারসাইজ – সেটা নিয়ে পরে কথা হবে। আপাতত ‘অপার্থিব’ চাইছে বাংলাভাষায় কল্পবিজ্ঞানকে এই ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করতে। বিলিতিরা কল্পবিজ্ঞানে আমাদের চাইতে কত উন্নত ও এগিয়ে আছে সেই সমস্ত আলোচনায় ঢুকতে চাইছিনা, সেই তুলনামূলক আলোচনা বিশেষ কোনো আলোকপাত করেনা।

সমস্যা ১ – সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যে জনেরিক সাহিত্যকে গুরুত্বপূর্ণ না মনে করা। যারা লিখছেন তারাও প্রাপ্য সম্মান বা উৎসাহ পান না।

সমস্যা ২ – জনেরিক সাহিত্যকে মূলত কিশোরপাঠ্য, বিনোদনধর্মী ভাবলে কিশোরদের সাহিত্যকেও যথাযথ মূল্য দেওয়া হয়না।

সমস্যা ৩ – আমাদের জনেরিক সাহিত্যের কোনো বিবর্তন ঘটেনি; অর্থাৎ ইতিহাসের সাথে কোনো জঙ্গম সম্পর্ক থেকে তার চ্যুতি হয়েছে।

২।

চোদ্দ মিনিটের যে ভিডিওটা লিংক দেওয়া হয়েছে এই পোস্টে সেটি সেঁজুতি দত্ত এবং স্নিগ্ধেন্দু ঘোষালের তৈরি – ‘অপার্থিব’-র প্রোমোশনের জন্যই তৈরি করা – কিন্তু ভিডিওটি সম্পাদনা করার সময়ে মনে হল যে সেটিকে আর বিজ্ঞাপন হিসেবে না ব্যবহার করাই ভালো, সিরিয়াস আলোচনা হিসেবেই রাখা থাক। ভেবেছিলাম এখানে আমারও দুপয়সার বক্তব্য থাকবে – কিন্তু আমি আর নাক গলালাম না ভিডিওয় – তার বদলে লিখলাম।

অনির্বাণ দাশ এবং দীপঙ্কর সেন দুজনেই অধ্যাপনায় আছেন, দুজনেই গোয়েন্দা গল্পের রসিক পাঠক (দীপংকর সেই ফিল্ডে গবেষণাও করছেন)। তারা মূলতঃ আলোচনা করেছেন বাংলা সাহিত্যে generic fiction-এর চর্চা আটকে গেছে কেন, বা তাকে বিনোদনমূলক বা বালকপাঠ্য মনে করা হয় কেন।

ভিডিওর বক্তারা গোয়েন্দা গল্প নিয়ে বলছেন বেশি, আমি বরং সায়েন্স ফিকশন নিয়ে দুচারটে কথা বলি। গোয়েন্দা গল্প আমার কাছে কল্পবিজ্ঞানের চাইতে প্রিয়তর জঁর, তা নিয়ে কথা বলতে গেলে লেখা মেনলাইন থেকে কর্ডলাইনে চলে যাবে।

কল্পবিজ্ঞান যে কিশোরপাঠ্য – আমাদের দেশে এই ধারণাটারও তো কোনো ঐতিহাসিক-সামাজিক ভিত্তি আছে। মেরি শেলীর ‘ফ্র্যাঙ্কেস্টাইন’ আদপেই শিশুপাঠ্য ছিল না। অতএব এটা পরে তৈরি হয়েছে, আমরা তৈরি করেছি। আমার মনে হয় বাঙালির এই বোধটা দাঁড়িয়ে আছে মূলত হলিউড-কেন্দ্রিক সিনেমা-টিভি সম্পর্কে অপর্যাপ্ত ধারণার উপর, কমিক্স নিয়ে অগভীর অনাধুনিক ভুল ধারণার উপর এবং এক সময়ে জুল ভার্নদের ব্যাপক জনপ্রিয়তায়।

এটা বাঙালির স্বভাব। সে একটি দুটি মডেল পেয়ে ভাবে পুরোটা বুঝে ফেলেছে। যে জন্যে গোয়েন্দা গল্পের ক্ষেত্রে শার্লক হোম্‌স বা এরকুল পোয়ারোর মডেলের বাইরে সে ভাবতে পারেনি। এক অদ্ভূত স্বল্পদৃষ্টি তাকে আমেরিকান হার্ড বয়েলড উপন্যাস পড়ায়নি, রেমন্ড শ্যান্ডলারের নাগরিক কাব্যের গদ্য চেনায়নি, আগাথা ক্রিস্টিরও আখ্যানগত বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিচিত করায়নি। আমি পাঠকদের কথা বলছিনা, লেখকদের কথা বলছি। সে জন্যই গোয়েন্দা গল্পের রসিক বাঙালি পাঠক একটা সময়ের পর থেকে বাংলা সাহিত্য থেকে আর কিছু প্রত্যাশা করা বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি ইংরেজি জানেন, যে ভাষায় অন্য ভাষার জরুরী সাহিত্য দ্রুত অনুবাদ হয়ে যায় – অতএব তিনি যদি একটিও বাংলা গোয়েন্দা উপন্যাস না পড়েন, তাতেও তার ভাঁড়ারে উপাদেয় সাহিত্য এত থাকে যে একটি জীবন কম পড়ে যেতে পারে। কল্পবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তথৈবচ।

কিন্তু আমার দুই আনার থিওরি আছে আরো কিছু। কেন জুল ভার্ন, বড়জোর রে ব্র্যাডবেরি বা আইজ্যাক অ্যাসিমভের বাইরে বাঙালির কল্পবিজ্ঞানের কল্পনা এগোলো না? কেন বাঙালি তার প্রিয় পরিচালক আন্দ্রেই তারকভস্কির ‘স্টকার’ বা ‘সোলারিস’ দেখতে গিয়ে সে ভুলে যায় যে দুটিই কল্পবিজ্ঞান ছবি? এবং ছবিগুলি বৌদ্ধিক ছবি কারণ কল্পবিজ্ঞানই তাকে একধরণের চিন্তার ভিত্তি দিচ্ছে?

কারণ কল্পবিজ্ঞানের প্রথম যুগটা দাঁড়িয়েই আছে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ইতিবাচক উদযাপনের উপর, উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের উত্তেজনার উপর – বাঙালি এই পর্যায়টা থেকে বেরোতে পারেনা। বিশ্বযুদ্ধের পর এবং কোল্ড ওয়ারের যুগে মানুষের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি যে সন্দেহ এসেছিল, মানুষ যে বুঝেছিল আধুনিকায়ন এবং প্রগতির প্রতিশ্রুতির হাত ছেড়ে বিজ্ঞান ক্ষমতা ও শাসকের মতাদর্শের হাতে কুক্ষীগত হয়ে যাচ্ছে, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হয়ে উঠছে, আবার ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করার পর তথ্যপ্রযুক্তি যে ফের ক্ষমতাহীন মানুষের হাতে অন্তর্ঘাতের আয়ুধ হয়ে উঠতে পারছে, আবার অধুনা তথ্য-প্রযুক্তি ও সোশাল মিডিয়া হয়ে উঠছে আমাদের জীবনকে তথ্যায়িত করার প্রকল্প – এই পরপর প্যারাডাইম শিফটকে বাঙালি লেখক চেনেননি, তার এখানে কিছু বলার নেই।

অদ্ভূত! হয়তো সেই বয়োজ্যেষ্ঠ লেখক পছন্দ করেন না যে বাংলা উপন্যাস স্বচ্ছন্দে কম্পিউটারে লেখা যায় – অথচ বিজ্ঞান-প্রযুক্তি থেকে ক্রিটিকাল দূরত্বকেও যে কল্পবিজ্ঞানে রাজনৈতিক করে দেওয়া যায় – এটাও তার মনে হল না। তাই তিনি কল্পবিজ্ঞান লিখতে গেলেই কিশোরপাঠ্য থ্রিল-ইদ্রেককারী একটা লেখা লেখেন, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চর্চার প্রতি কোন সন্দেহও তার থাকে না – তিনি সেই সেলিব্রেটরি ধরণের লেখা লেখেন। তিনি পড়ে থাকবেন নিউটোনিয়ান জগতে, আইন্সটাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি যে দর্শন, ইতিহাসবোধ, অর্থের রাজনীতির ক্ষেত্রে পালাবদল ঘটিয়ে দিয়েছিল, অতএব সাহিত্যে তার প্রতিফলন যে অবশ্যম্ভাবি – একশো বছর হল তিনি বোঝেননি। তার অগ্রজদের (যারা এইধরণের সাহিত্য লেখেননি যদিও) লেখায় সমসাময়িক বিজ্ঞানের দার্শনিক প্রভাব পড়েছিল – জীবনানন্দ, মানিকের উপর সে প্রভাব আছে – তার উপর আর পড়ছেনা। বিজ্ঞানের প্রতি তার তেমন উৎসাহ নেই, অতএব কল্পবিজ্ঞানকে অবজ্ঞা করেন তিনি; বা লিখলেও প্রযুক্তি থেকে তার দূরত্ব তাকে আধুনিকতা নিয়ে ক্রিটিকাল হতে দেয়না। শুধু যে বিজ্ঞানকে না বোঝার ভীতি ও হীনমন্যতা তার মধ্যে কাজ করে তাই’ই নয়, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রতি একটা সেকেলে সম্ভ্রমও কাজ করে। বিজ্ঞানের চর্চার মধ্যে যে অন্তর্গত রাজনীতি আছে সেটা তার জানা নেই, তিনি বিজ্ঞানচর্চাকে অরাজনৈতিক ভাবেন। তাই তাকে কল্পবিজ্ঞান লিখতে দিলে তিনি সেই জুল ভার্নের মত অ্যাডভেঞ্চারই লিখবেন এখনও, বিজ্ঞানের অর্জন ও সম্ভ্রম-উদ্রেককারী বিস্ময় নিয়ে লিখবেন । এবং এর মাঝেও যারা লিখছেন, অন্যরকম ভাবে লেখার কথা ভাবছেন – তারা সমাদর পাচ্ছেন না তেমন, তাদের লেখা লোকে পড়ছে কম, তারা উৎসাহ হারালে তাদের প্রতি অভিযোগের কিছু থাকেনা। আমিও উৎসাহ হারাতে পারি। লেখক-শিল্পী পাঠকের কাছে স্বীকৃতির জন্য কাঙাল হন।

কল্পবিজ্ঞানের লেখককে বৈজ্ঞানিকও হতে হবে না, বিজ্ঞানের ছাত্রও হতে হবেনা। জ্ঞান ও গবেষণানির্ভর কল্পবিজ্ঞান, সেরকম যে হয়না তা নয় – সেরকম সাহিত্যকে বলা হয় hard science fiction – সেটা একান্তভাবেই দাঁড়িয়ে আছে বৈজ্ঞানিকের সাহিত্যপ্রীতির উপর। আমি স্কুল লেভেলের বিজ্ঞান ভুলে গেছি; কিন্তু ডিজিটাল যুগ আসার পর প্রযুক্তির সাথে নিবিড়, দৈনন্দিন এবং উত্তেজক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে ফের। অতএব আমি যে কল্পবিজ্ঞানে প্রবেশ করতে চাইছি, এই সাহিত্য যতটা না বিজ্ঞানের, তার চাইতেও আমার বর্তমান থেকে প্রসূত কল্পনার।

কিন্তু কি কল্পনা করবো? অনেক কল্পবিজ্ঞান যেমন ভবিষ্যতের গল্প বলে, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ভবিষ্যত কল্পনা করবো? করতে গিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করবো, প্রগতির জয়গান করবো, আবিষ্কারের অভাবনীয়কে ভাববো? তাহলেও তো আমি বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির ‘অরাজনৈতিক’ বিবর্তনের আখ্যানের ফাঁদে পড়ে যেতে পারি। আবার বিজ্ঞানবিরোধী হয়ে রিগ্রেসিভও তো হতে চাইবো না।

ভবিষ্যতের মানুষ, ভবিষ্যতের বিজ্ঞান, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি – এসব কল্পনা করতে হয় লিখতে গেলে (এমনকি গল্প যদি বর্তমানেরও হয়; তাহলেও কল্পবৈজ্ঞানিক ট্রোপগুলি কল্পিত ও অচেনা থাকে, তাই তা’ও ভবিষ্যতের বলা যায়)। কিন্তু কল্পনাটা তো স্রেফ একটা মাধ্যম। সেই মাধ্যম দিয়ে কি করার?

আমি জনেরিক ফিকশনই লিখে চলবো (হয়তো কল্পবিজ্ঞান আর নাও লিখতে পারি) – কারণ জনেরিক ফিকশনে কিছু নিয়ম, প্রথা, অর্থনির্মাণের অভ্যেস থাকে, একটি কোডেড জগত থাকে – যা ব্যক্তিলেখকের উর্দ্ধ্বে, এইটা আমার পছন্দের ক্ষেত্র। সেই জগত লেখক ও পাঠক দুজনেই একসাথে তৈরি করেন, জঁরের জগত একটি টেক্সটে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, তার শর্তই হল পূর্বের লেখা নিয়ে সচেতনতা। যেমন আমি নিশ্চিত যে ‘অপার্থিব’-র পাঠক আমার চাইতে ঢের ঢের বেশি পড়েছেন এমন সাহিত্য, বিজ্ঞানেও আমার চাইতে ঢের বেশি জ্ঞানী তিনি। আমার কাজটা অতএব সহজ এই উপন্যাসে। আমি স্রেফ কিছু সুত্র দেবো তাকে, যার মাধ্যমে তিনি তার প্রিয় রেফারেন্সগুলি টেনে নিয়ে এসে উপন্যাসের ২০৬৫-র জগতটা তৈরি করে নেবেন। এই জগত ব্যক্তিলেখক একা তৈরি করেন না, পাঠকের রেফারেন্স আমার চাইতে সবসময়েই বেশি থাকবে। আমার কল্পনার কাজ স্রেফ হাইকু বা পথনাটিকার মত কিছু সুত্র দিয়েই সরে যাওয়া।

কল্পনা যদি মাধ্যম হয় মাত্র, প্রথা যদি আমি মেনে চলি পরিকল্পগুলির – তাহলে সেই প্রথা আর মাধ্যম নিয়ে আমার কি করার থাকতে পারে?

লেখক যা করতে চায় – ব্যক্ত করার থাকে অনেক কিছু। কিছু বক্তব্য বা অভিব্যক্তি হয়তো কল্পবিজ্ঞানের মাধ্যমে হয়তো জোরালো ভাবে পেশ করা যায়।

সাহিত্যে লোকশিক্ষে হয় হয়তো (আমার দ্বারা হবে না), সাহিত্যে দিকনির্দেশ দেওয়া যায় হয়তো (আমার চোখে চালসে, কিচ্ছু করার নেই, কোথাও যাওয়ার নেই), সাহিত্যে হয়তো বাসযোগ্য পৃথিবী নির্মাণ করা যায় নবজাতকের জন্য। আমি ব্যক্ত করতে চাই এমন অভিব্যক্তি যা শিল্পের, সাহিত্যের পরিসরের বাইরে আমার বলতে অসুবিধে হচ্ছে। আমি অধ্যাপনা করি – সাহিত্যে হয়তো বলতে চাই যা ক্লাসরুম-সেমিনার-লেকচার আমাকে বলতে দিচ্ছেনা। আমার অভিব্যক্তি তো আমার সময়, আমার ইতিহাস, আমার সামাজিক-রাজনৈতিক অস্তিত্ব থেকেই আসবে। সাহিত্যের, শিল্পের দোরগোড়ায় আসাটা আমার শেষ পারানির কড়ি – অবসরের নয়, না বলতে পারা কথার অবশ্যম্ভাবী অবলম্বণ।

অথচ এর জন্যে আমি generic জগতগুলিকে নেহাতই ব্যবহার করতে চাইনা, সাহিত্যধৃত জগতকে দুমড়ে-মুচড়ে আমার অভিব্যক্তির মানানসই করতে চাইনা। আমি চাই ব্যক্তির উর্দ্ধে নির্মিত একটি নিয়মমাফিক জগতে ব্যক্তিগত উচ্চারণের জায়গা করে নেওয়া।

যেমন – ‘অপার্থিব’ যদি ভিনগ্রহীর সাথে প্রথম মোলাকাত, বা alien contact-এর গল্প হয় তাহলে নিয়ম বা প্রথা হল যে এই মুহুর্তটা হবে প্লটের অন্যতম নাটকীয় মুহুর্ত। আমি সেই প্রথাগত মুহুর্তকে বাঁ হাতে লিখে তার আগে ও পরে ‘আমার অভিব্যক্তি ও ভাবনায়’-তে সরে যেতে পারিনা। বরং আমার অভিব্যক্তি ব্যক্ত হবে সেই দৃশ্যের মাধ্যমেই।

এলিয়েন কন্ট্যাক্ট একেক লেখকের কাছে, কমিক্স-শিল্পীর কাছে, চলচ্চিত্রকারের কাছে একেকরকম। সত্যজিৎ রায়ের কাছে – ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’, ‘অঙ্ক স্যার, গোলাপীবাবু আর টিপু’ বা তার অনির্মিত ‘এলিয়েন’-এ – এই ভিনগ্রহী হল দূর্বল ও প্রান্তিক মানুষের বন্ধু; স্পিলবার্গের ‘ক্লোজ এনকাউন্টার্স অফ দ্য থার্ড কাইন্ড’-এ এলিয়েনের সাথে কন্ট্যাক্ট হয়ে ওঠে তূরীয় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মত; রিডলি স্কটের ‘এলিয়েন’-এ ভিনগ্রহী ভয়াবহ আতংক। ভিনগ্রহী বা এলিয়েনের তেমন কোনো স্বকীয় মূল্য নেই, সময়ে গ্রন্থিত মানুষের কল্পনায় সে কি, তার সাথে মোলাকাতই বা কিসের দ্যোতনা আনে – সেটাই তার মূল্য।

এক্ষেত্রে আমাকে বুঝতে হয় এলিয়েন এবং কন্ট্যাক্ট আমার কাছে কি অর্থ করবে – সেটাই আমার অভিব্যক্তি। এবং এই অভিব্যক্তি ব্যক্ত করার সময়ে আমি কিছুতেই নেহাতই বিনোদন উদ্রেক করতে পারিনা। আবার অতীতে এই trope-টি বিভিন্ন লেখক ও শিল্পী কি ব্যক্ত করতে ব্যবহার করেছেন তার সচেতনতাও জরুরী। এখানেও লেখকের চাইতে পাঠকের অভিজ্ঞতা বেশি, তিনি আরো বেশি পড়েছেন এবং দেখেছেন। সেই পড়া এবং দ্যাখার সাথে তিনি যাতে একটি সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন সেই পরিসরটুকুও আমাকে খোলা রাখতে হবে।

‘অপার্থিব’-য় এইগুলোই চেষ্টা করা হয়েছে।
cropped-softcover-trade-book-psd-mockup-aparthibo.png

Advertisements

4 Replies to “বাংলায় গোয়েন্দা-হরর-কল্প-ফ্যান্টাসি: অহৈতুকী সাহিত্য?”

  1. দুটো কথা।
    জঁরের বাংলা কেউ কেউ ব্যবহার করে থাকেন ‘সংরূপ’ (শব্দটা অভিধানে পাইনি। কোত্থেকে এল জানি না)। সেই অর্থে genericএর বাংলা ‘সংরূপগত’।
    আর, কল্পবিজ্ঞানের মতো সংরূপ বাংলায় জনপ্রিয় না হওয়ার বিবিধ সামাজিক কারণ দেখানো যায়। কিন্তু দিনের শেষে এই কথাটাও স্পষ্টাক্ষরে জানিয়ে রাখা ভালো, বাঙালি লেখকেরা যদ্দিন না বিজ্ঞানশিক্ষিত হচ্ছেন, বাংলা কল্পবিজ্ঞানের কোনো আশা নেই। আসিমভ, ক্লার্কের মতো বিজ্ঞানে দখল কোন বাঙালি কল্পগল্প রচয়িতার আছে? ফলে, ওই সত্যজিতের মতো, মোষের শিং আর চকমকি পাথর দিয়ে উড়ন্ত ধাতু শ্যাংকোভাইটের গপ্প লিখে যেতে হচ্ছে।
    হার্ড এস এফের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। গিবসনের নাগরিক নোয়ার, লেমের উইট, ল্য গুইনের জেন্ডার্ড এস এফের সঙ্গেও আমাদের লেখকরা খুব পরিচিত কি? সংরূপের নানা ভাগ, তার পুরো বর্ণালিটাই জানব না, আর দুর্দান্ত কল্পবিজ্ঞান লিখব, তা কি আর হয়!
    বাঙালি লেখকরা আগে কল্পবিজ্ঞান পড়ুন। লেখালিখি পড়ে হবে।

    Like

    1. Shyam এই ব্লগের প্রথম মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ! একদম সঠিক কথা বলেছেন। সবকিছু পড়া না থাকলেও – খোঁজখবরও রাখা যায় কি হচ্ছে বিশ্বসাহিত্যের। তাতেও ইন্টারেস্টিং ভাবনাচিন্তার খোরাক মিলতে পারে।

      Like

  2. একটা প্রশ্ন সর্বদা ভাবায়। বাঙলা সাহিত্যের পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে তো সমস্ত শিক্ষাস্তরের ও সমস্ত আর্থসামাজিক স্তরের মানুষই রয়েছেন। তাহলে জঁর ফিকশানের ব্যাপারে এহেন একটা বিচিত্র কনসেপ্ট গোষ্ঠীমানসে সঞ্চারিত হবার কারণটা কী হতে পারে? “এরা এইরকমই”, বা “এরা অপরিণত” এই ধরণের সুইপিং রিমার্ক তো আকছারই দেখছি। তার বাইরে কোন লজিক্যাল কারণ কি আমাদের ইতিহাস, কৌম সংস্কৃতি বা আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে খুঁজে পাওয়া যাবে? রোগট তো দেখাযাচ্ছে। তার কারণটা ঠিক কী?

    Like

    1. জঁরের সাথে শিক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তু। ধরুণ আমেরিকান সাহিত্য ও সিনেমা বেশিরভাগই জঁরধর্মী – তার কারণ এই নয় তারা শিক্ষিত। বরং সিনেমা ও জনপ্রিয় সাহিত্যের শুরুর দিকে জঁর ওখানে এত তাড়াতাড়ি দানা বেঁধেছিল কারণ সেগুলো পড়তো/দেখতো নিম্নবর্গের লোকেরা। তাদের সুবিধে হত যে এই বই ওয়েস্টার্ন, ওই ছবি গ্যাংস্টার – এইরকম ক্লাসিফিকেশনে। বরং আমাদের সংস্কৃতিতে যে গোয়েন্দা গল্প, হরর, ফ্যান্টাসি, সাই ফাই-এর প্রতি নাক সিটকোনো ভাব – এটা আসছে একধরণের শিক্ষা আর রুচিপ্রাপ্তির ইল্যুশন থেকে। ওগুলোয় স্রেফ বিনোদন হয় আর সামাজিক/মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হয় ‘সিরিয়াস’ বাস্তববাদী উপন্যাসে – এখানেই এই নাক উঁচু ভাবটা আছে। আমার এই লেখার আপনি যেটা চাইছেন – সেই বিশ্লেষণটা – সায়েন্স ফিকশনের ক্ষেত্রে – একটু করার চেষ্টা করেছি।

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s