সত্যজিৎ রায়, প্রফেসর শঙ্কু এবং আমাদের কল্পবিজ্ঞানের কল্পনা

ঠিক যেমন সিনেমায় এবং গোয়েন্দা গল্পে – কল্পবিজ্ঞান গল্পের ক্ষেত্রেও বাঙালিদের সত্যজিৎ রায়ের দীর্ঘ ছায়ার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার কথা, আবার প্রয়োজন তাকে ছাড়িয়ে কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়া। না হলে পিতৃছায়ায় স্বাবলম্বন তো হল না আর।

আমার লেখা প্রথম উপন্যাস বেরোচ্ছে, এবং সেটি কল্পবিজ্ঞান কাহিনী (অর্থাৎ কিনা আমার লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস কল্পবিজ্ঞান নাও হতে পারে, বা আমি দ্বিতীয় কোন সায়েন্স ফিকশন নাও লিখতে পারি)। আমি যেহেতু আদতে সিনেমার লোক, আমার একটি ভিন্ন গল্পবিশ্ব আছে ধার নেওয়ার জন্য; এবং আমার গল্পের যা মেজাজ – সেক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের প্রভাবের থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল।

কিন্তু সেটা ধৃষ্টতা না হলেও, অকৃতজ্ঞতা হত। এখন বুঝি যে সত্যজিৎ প্রায় একাই বাংলায় জনেরিক ফিকশনের চর্চাটা বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। বাকিরাও ছিলেন – কিন্তু তিনি মূলধারায় টিকিয়ে রেখেছিলেন এই কল্পনা। তার তিরোধানে সেই কল্পনায়ও যে ভাটা পড়েছে – তার কি আর প্রমাণ লাগে? তিনি কি শ্রেষ্ঠতর ছিলেন – ডিটেকটিভ গল্প ও সায়েন্স ফিকশনের জগতে? ছিলেন না। কিন্তু তিনি বাঙালির বিপন্ন আধুনিকতার সময়ে এই কল্পনাটিকে জিইয়ে রেখেছিলেন, যে কল্পনার ক্ষতি হয় আধুনিকতার আপৎকালে।

‘কল্পবিজ্ঞান’ আর ‘সায়েন্স ফিকশন’ অর্থে ঠিক একইরকম নয়, ইংরেজিতে ‘কল্পনা’ বা ‘ফ্যানসি’-র দ্যোতনাটা ঠিক আসেনা। সেই নিয়ে ভিন্ন আলোচনা হতে পারে, সে পান্ডিত্য আমার নেই, বরং এই লেখায় তা নিয়ে বিশদে পড়তে পারেন। আমাদের কল্পবিজ্ঞানে একধরণের আধুনিকতার সম্মুখীন হওয়ার পরে সেই আধুনিকতায় আমাদের সম্ভাব্য প্রতিপত্তির কল্পনার গল্পই আমরা ভালোবাসতাম বেশি।

ঘনাদা – তার tall tales-এ – আর গিরিডিবাসী ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর আন্তর্জাতিক অভিযানগুলিতে সেই wish-fulfillment ছিল প্রাথমিকভাবে। ঘনাদার কথা থাক (কারণ সেই বাল্যকালের পড়ার পর এখন বুঝি ঘনাদা ঠিক বালকোচিত নয়, আবার পড়তে হবে)। প্রফেসর শঙ্কু আমাদের ভালো লাগতো কারণ শঙ্কু কি এক অসম্ভবে তার দূর্দান্ত গবেষণা আর আবিষ্কারগুলি করতেন ছা-পোষা, ঘরোয়া অবস্থাতেই, কিন্তু তার দাপট ছিল বিশ্ব ও ব্রক্ষ্মান্ড জুড়ে। অর্থাৎ যখন এগুলি লেখা হচ্ছে তখন বাঙালির ‘a brave new world’-এর সম্মুখীন হওয়ার সাহস ছিল, ইচ্ছে ছিল, স্বপ্ন ছিল।

যেটা সত্যজিৎ করেছিলেন তার সিনেমা দিয়ে – লোকাল সিনেমা, গ্লোবাল বিশ্বজয়!

এক্ষেত্রে শঙ্কু আবার কীভাবে সত্যজিতেরই ফ্যান্টাসি সেটাও ভাবা যাক। সত্যজিৎ আজীবন ন্যুণতম খরচে, সামান্যতম আয়োজন দিয়ে তার ছবিগুলি বানালেন। কিন্তু তার একমাত্র সায়েন্স ফিকশন ছবি Alien (যার সাথে আমার ‘অপার্থিব’-র আত্মীয়তা কাকতালীয় নয়) – যা হলিউডের অর্থ ও পরিকাঠামো ছাড়া হত না – তা তো হলই না, বরং স্পিলবার্গের দৌলতে কল্পনার পিতৃত্বও গেল

তাও ভিনগ্রহীরা যে আগ্রাসী ঔপনিবেশিক রাক্ষস-খোক্কস, প্রযুক্তিতে উন্নত অথচ খাদ্যাভ্যাসে নরমাংসলোলুপ জন্তু, বিপুল প্রজননশীল কীট – এই উগ্রমার্কিন এবং দক্ষিণপন্থী ভাবনার কাউন্টারপয়েন্ট আমাদের ছিল ভাগ্যিস সত্যজিৎ ছিলেন বলে। সত্যজিতের এলিয়েন এবং অ্যাং-রা হাবা এবং বঙ্কুবাবুদের বন্ধু হত, অপরের প্রতি প্যারানোইয়া তার ছিল না।

কিন্তু বিদেশে ব্যর্থতা – শঙ্কুর তা হয়নি। শঙ্কু যেমন সত্যজিতের মতই দেশের আবিষ্কার বিদেশে সফলভাবে প্রমাণ করেছেন, সেভাবেই বিদেশের ল্যাবরেটরিতে ও প্রেক্ষাপটে তার প্রতাপ অদম্য ছিল। সত্যজিৎ তার ছবিতে ‘টেকনিক’-কে ‘টেকনলজি’-র বশংবদ হতে দেননি কখনো, এবং সিনেমা যতদিন থাকবে, এই জন্যই সত্যজিৎ স্মরনীয় থাকবেন, যদি না স্বল্পদৃষ্টি আমাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে দেয়। শঙ্কুর গল্পে টানা দেখে গেছি আমরা করাপ্ট বৈজ্ঞানিক – ক্ষমতার লোভ যাদের পতনের পথে নিয়ে গেছে – দেখেছি অর্থপিশাচ ধনতান্ত্রিক – যাদের মুনাফার লোভের ফলে নাকানিচোবানি খেতে হয়েছে শেষমেশ – দেখেছি যুক্তির ফাঁদে যাদের কল্পনা সীমিত হয়ে গেছে সেইসব লোকেরা হতবাক হয়ে গেছে প্লটের নানান বাঁকে। ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুকে সেরকম ধাক্কা খেতে হয়নি কখনো, কারণ তিনি বিস্ময়ের জন্য, অভাবনীয়র জন্য প্রস্তুত থাকতেন, এমনকি যা বিজ্ঞানের আওতার বাইরেও – তার জন্যও।

যেমন – অত্যাশ্চর্য ‘একশৃঙ্গ অভিযান’।

কিন্তু বাঙালির সেই আধুনিকতার যাত্রায় আমরা নেই আর। আমার উপন্যাসে দারিয়াস মজুমদার যখন শীতঘুম ভেঙে উঠে দেখে প্রক্সিমার সেন্টরির তারকামন্ডলে করোনা গ্রহের বায়ুমন্ডলে সে প্রবেশ করছে – তখন তার অভিঘাত হয় ভিন্নতর।

সত্যজিৎ ফেলুদাকে ছেলেমানুষি গল্পে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। তাতে তার গোয়েন্দা গল্পের ক্ষতি হয়েছিল – তার নিজেরই আর লিখতে ভালো লাগতো না। শঙ্কুকে সেরকম গল্পে সীমাবদ্ধ রাখায় ক্ষতিটা তেমন হয়নি। সে ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাটা ছিল ওই অ্যাডভেঞ্চারের আখ্যানকাঠামোটা – যেখানে সাফল্য গল্পের শেষে আসতেই হয়, শঙ্কুকে হতে হয় সুপারনায়ক।

কিন্তু সত্যজিৎ নিজেই অন্তত একটি গল্প লিখেছিলেন যা একটি ভিন্ন কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়, ইঙ্গিত দেয় ভিন্ন দার্শনিকতার। ‘কম্পু’ আমার মতে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি গল্প। এবং একটি প্রাপ্তবয়স্ক গল্প। কম্পু, আর সত্যজিতের বন্ধু আর্থার সি ক্লার্কের (এবং অবশ্যই স্ট্যানলি কুব্রিকের) HAL – এই দুই কৃত্রিম চেতনার ছায়ায় আছে আমার রোজবাড।

‘অপার্থিব’-য় শঙ্কুর গল্পের ছায়াকে আমি অস্বীকার করিনি, কেবল কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। ‘কম্পু’, ‘একশৃঙ্গ অভিযান’ এবং বিশেষ করে ‘স্বপ্নদ্বীপ’, শঙ্কুর এই গল্পগুলি আমার গল্পের পূর্বসূরী হিসেবে আছে বলেই ভাবতে ভালোবাসি।

তার কল্পবিজ্ঞানের কল্পনার সবই হয়তো আছে অল্প-স্বল্প খুচরোয় আমার গল্পে; পুঁজির ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান এবং বিস্ময়। তবে মূল কাঠামোটি সেভাবে নেই, কারণ আমাদের সেই আধুনিকতাও আর নেই।

Softcover Trade Book PSD Mockup - Aparthibo

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s