‘অপার্থিব’ নিয়ে তমোঘ্ন

এই লেখাটি তমোঘ্ন হালদার – আমার অন্য ব্লগের সহলেখক – লিখেছিল ‘অপার্থিব’-র প্রথম ড্রাফট পড়ে। তমোঘ্ন – অনেক সময়েই – এমন গাঢ় গদ্য লেখে যাতে ব্যক্তিগত এবং ঐতিহাসিক মিলিয়ে মিশিয়ে থাকে। আমি বুঝতে পারিনি যে ‘অপার্থিব’ এমন একটি গদ্য – যা কিনা আদপেই রিভিউ নয় , বরং বলা যায় উপন্যাসটির পূণর্লিখন – ট্রিগার করতে পারে। নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম।

।।গৌরচন্দ্রিকা।।

কোনো ছবি দেখে অথবা লেখা পড়ে, নিজস্ব অনুভূতির কথা প্রকাশ্যে জানানো সবসময় জরুরী নয়, কিন্তু কখনো কখনো ভিতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে কথাগুলো কারণ তা প্রকাশ্যে না লিখতে পারলে বা না বলতে পারলে নিজের ভিতরে ক্রমাগত একধরণের অস্বস্তি কাজ করতে থাকে। এইমুহূর্তে যে উপন্যাসটি নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন বলে মনে হচ্ছে, তার নাম ‘অপার্থিব’। লেখকের পরিচয় অনিন্দ্য সেনগুপ্তও হতে পারে, আমার বন্ধু বা দাদাও হতে পারে। অতএব বোঝাই যাচ্ছে, দিনশেষে এই লেখার পারস্পরিক পৃষ্ঠকুণ্ডয়ন সমিতির ম্যানিফেস্টো হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবু যথাসম্ভব চেষ্টা থাকবে, চাটুকার না হয়ে ওঠার, যথাসম্ভব অব্জেক্টিভ থাকার। ঠিক এখানেই জরুরী প্রশ্নঃ একজন মানুষের প্রতি অব্জেক্টিভ থাকা যায় বা শিল্পীর প্রতি অব্জেক্টিভ থাকা যায়, কিন্তু যদি সেই সৃষ্টি কোনো দুর্বল মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় পূর্বজন্মের স্মৃতি অথবা ছুঁয়ে যায় অন্য কোনো অনুভূতি, যদি নিজের জোরে তা জায়গা করে নেয় ব্যক্তিগতর খাতায়, তাহলে? সেক্ষেত্রেও কি নৈর্ব্যক্তিক উচ্চারণে মূল্যায়ণ করতে হবে সেই সৃষ্টির? উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘মাসান’ আমার দেখা শ্রেষ্ঠ হিন্দি ছবি নয়। কিন্তু আমার পক্ষে সে ছবির পুঙ্খানুপুঙ্খ রিভিউ লেখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি আজ অব্দি- কারণ নৈর্ব্যক্তিক উচ্চারণ সম্ভব ছিলনা। তাছাড়া আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সাহিত্য-স্থাপত্য-ভাস্কর্য্য অথবা ছবির রিভিউ লেখার জন্যে যতটুকু পড়াশোনা থাকা প্রয়োজন, তা আমার নেই। আমি তাই সবসময়েই বড়জোর কিছু অনুভূতির কথা জানাতে পারি, ‘রিভিউ’ লিখতে পারিনা। যেমন মাসান দেখার পর চার লাইনের একটি আপডেট দিয়েছিলাম। অর্থাৎ এতক্ষণে বোঝা হয়ে গেছে, ‘অপার্থিব’ এইমুহূর্তে সেই জায়গা জুড়ে আছে, যেখানে শৈল্পিক উৎকর্ষের নিরিখে তাকে যাচাই করা সম্ভব হবেনা আর। সে ছিটকে বের করে এনেছে আমার ব্যক্তিগত যাপন আর এই বেরিয়ে আসা মোটেই সুখকর অভিজ্ঞতা নয় বরং এতে যন্ত্রণা অনেক বেশী কিন্তু তাও, ভারী আনন্দ হচ্ছে। নিশ্চিত ধ্বংসের লক্ষ্যে কক্ষচ্যুত হওয়া গ্রহাণুপুঞ্জেরও কি আনন্দ হয়, এরকমই?

।।প্রাককথন।।

একবিংশ শতকের ইতিহাস, অন্ততঃ প্রথম সিকিভাগের ইতিহাস যে ঘরছাড়া মানুষের ইতিহাস হতে চলেছে, এ বিষয়ে আমি একপ্রকার নিশ্চিত। অথবা বলা ভাল নির্বাসনের ইতিহাস। যেমন মৃত্যু পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে স্বর্গ অথবা নরক অথবা মধ্যবর্তী কোনো কম্পাসবিহীন জাহাজের পেটে তেমনই নির্বাসিত মানুষেরও একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে, অনেক সময়েই। সেই প্রতিটি গন্তব্যের নাম ও ধরণ আলাদা, তাই যাত্রাপথটুকুও আলাদা হয় নিয়ম মেনেই। নির্বাসিতের মেধাগত শ্রেণীবিভেদ অনুযায়ী ঠিক হয় যাত্রাপথের নাম। তেমনই, আমার যাত্রাপথের নাম ছিল, তেভা ভারাভ- অর্থাৎ এস্তোনিয়ান ভাষায় স্বর্গের সিঁড়ি। তেভা ভারাভের ভিতর দিয়ে যাত্রা করার সময়ে বাইরে কি ঘটছে বোঝার উপায় থাকেনা কারণ সেই সময়ে যাত্রীর বায়োফিজিক্যাল কন্ডিশনকে শীতঘুম বলা চলে। একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে টাইমজোনটিও পাল্টে যায়। আর পাঁচটি নির্বাসন-গন্তব্যের যাত্রাপথের সঙ্গে তেভা ভারাভের অবশ্য কিছু ফারাক আছে। মূলতঃ একধরণের টাইম ওয়ার্প ঘটে থাকে তেভা ভারাভের সুড়ঙ্গের ভিতর আর এছাড়াও কিছু অজানা অস্তিত্ব এসে বাসা বাঁধে নির্বাসিতের শরীরে। এর নিশ্চিতভাবেই একটি ফলাফলও আছে, কিন্তু স্রেফ সময় বলতে পারে সেই অস্তিত্বের প্রভাব কখন কোথায় এবং কীভাবে বোঝা যাবে এবং একজন সর্বোচ্চ মেধার মানুষের পক্ষেও এই ফলাফলের অভিমুখ পাল্টে দেওয়া সম্ভব নয়। আর আমি তো নেহাতই কিশোর রেনেতো, আমি তো পশ্চিমের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিতে চেয়েছিলাম, খালি খুব ক্লান্ত লাগছিল আর আমি জানতাম এ দুনিয়ার পশ্চিমপ্রান্তে ঘুম বড় দুর্লভ, ম্যালেনা – তাই আমি একটু ঘুমিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। বুঝিনি সে ঘুম আসলে তেভা ভারাভের শীতঘুম। বুঝিনি, তেভা ভারাভের যাত্রাপথ আসলে কর্পোরেশনের ঠিক করে দেওয়া নির্বাসন গন্তব্যের সুড়ঙ্গ।

।।কিছুদিন পরে।।

পৃথিবীর হিসেবে তিনমাস হয়েছে, আমি করোনাতে – নির্বাসিত। যেখানে আসার সময়ে তেভা ভারাভের পথে আমার শরীরে ঢুকে পড়েছে কিছু কণা যাদের কোনো অবয়ব নেই। যাদের মানুষের মত শরীর নেই আর তাই এদের এলিয়েন বলা চলে না ঠিক। এদের কোনো নির্দিষ্ট খ্যাতি বা কদর নেই তেভা ভারাভের ওপারে কারণ কর্পোরেশন অধ্যুষিত দুনিয়া স্রেফ কিছু ধাতব-অতিধাতব-অধাতব ইত্যাদি গোত্রের সিগনাল রিসিভ করতে পারে। সেই সিগনালে ধরা দেয়না যা, অর্থাৎ আর্যভট্টের শূন্য অথবা নবারুণের পাগলীর প্রলাপ, অর্থাৎ যা আপাতভাবে না থেকেও আসলে প্রবলভাবে রয়ে গেছে মহাকালের শরীরে, তাকে ইন্টারপ্রেট করা কর্পোরেশনের ক্ষমতার বাইরে। ওই অবয়বহীন ইন্টেলিজেন্স আমার শরীরে কি প্রভাব ফেলবে তা আঁচ করতে পারলেও তার অভিমুখ পাল্টানোর শক্তি আমার নেই। কারোর নেই। এমনকি অভিপ্রায়ও নেই। অভিপ্রায় নেই কারণ আমি জানি আমি নির্বাসনে থেকেও অন্তর্ঘাত চালিয়ে যেতে পারব। আসলে ক্রমে কিছু তথ্য সামনে আসছে। তথ্য সামনে আসছে নাকি ইকিরার সাথে সঙ্গমকালে আমার ভিতরে সঞ্চারিত হয়েছে আরো কিছু নির্দিষ্ট ধরণের ইন্টেলিজেন্স তা আমি জানিনা। ইকিরা যদিও সেই অর্থে নির্বাসিত নয়। এবং ইকিরা আত্মহত্যা করে, আমার প্রাক্তন প্রেমিকার মতই। তবে প্রশ্নটা আত্মহত্যার নয়, প্রশ্নটা ইন্টলিজেন্সের। আমি মনে করছি আমার পক্ষে পাল্টা অন্তর্ঘাত চালানো সম্ভব, নিজেকে ধ্বংস করেও, কারণ তেভা ভারাভের টিকে থাকার জন্যে যে প্রবল নেগেটিভ এনার্জি প্রয়োজন তা তৈরী করাই হয়েছে অন্তর্ঘাতের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ভীষণ সূক্ষ্ণ এই মেটান্যারেটিভ কারণ অভিপ্রেত অন্তর্ঘাত আর ঘটমান অন্তর্ঘাতের অভিমুখ বিপরীত। অভিপ্রেত অন্তর্ঘাতের অভিমুখ তেভা ভারাভের ওপ্রান্ত থেকে এপ্রান্তে অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শক্তিই তার আদি উৎস। উপরন্তু কর্পোরেশনের দিক থেকে অ্যানার্কিস্টদের নির্বাসিত করার জন্যে এর চাইতে ভালো জায়গা হয়না। কিন্তু ঘটছে উল্টোটা কারণ ঘটমান অন্তর্ঘাতের অভিমুখ পৃথিবীর দিকে, তেভা ভারাভ সৃষ্টির উদ্দেশ্যটুকুই যে অন্তর্ঘাত।

।।এরও কিছুদিন পরে।।

প্রিয়তমা, জানলে দুঃখ পেতে পার, যতদিন যাচ্ছে ততই আমি হ্যাকার হিসেবে উন্নততর হয়ে উঠছি। আমি ঢুকে পড়তে পারছি আমাদের যাবতীয় অতীত কথোপকথনের মেটান্যারেটিভে। আমি খুঁড়ে দেখছি জান্তব যৌনতার পরে আমাদের গায়ে লেগে থাকা আদরের গন্ধ। নিরোধের এপাশের বীর্য আর ওপাশের রক্তের মাঝের যে দেওয়ালের নাম আমরা দিয়েছিলাম নিরাপত্তা, সেই দেওয়ালের গায়ে লেগে থাকা গন্ধ আসলে আমাদের যৌথযাপনের একটি কোডমাত্র, আর কিছু নয়। আমি সেই কোড হ্যাক করবই, প্রিয়তমা। না, পুরোটা করে উঠতে পারিনি এখনো, কিন্তু যে দ্রুততায় আমি পড়ে ফেলছি মৈথুন পরবর্তী নৈঃশব্দ, তাতেই বেশ বুঝতে পারছি যে হ্যাকার হিসেবে আমার ভবিষ্যত উজ্জ্বল। তাই একদিন আমি পড়ে ফেলব আমাদের ঘামের গন্ধে লেখা সমস্ত কোড, অথবা কবিতা। কবিতা, অর্থাৎ যা আমি খুঁজে পাচ্ছি সেইসমস্ত ঘটনায় যা তোমার মতে স্রেফ কোইন্সিডেন্স ছাড়া কিছু নয়। কবিতা, যা নিশ্চিতভাবেই আমাদের ওই গন্ধটুকু খুঁড়ে খুঁজে পাওয়া কোডের শরীরে ঢুকিয়ে দিতে পারব আমি। আর তারপরেই নিঃশব্দ বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হবে তোমার শরীর কারণ কোডকে কবিতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে তোমার মেধা আর পুঁজির সাথে কবিতার যে সংঘর্ষ হবে, তাতে বিস্ফোরণই একমাত্র ভবিতব্য। তোমায় মরতে দেখতে কষ্ট হবেনা একথা বলতে পারিনা, কিন্তু শেষপর্যন্ত তো মানবসভ্যতার ইতিহাস শ্রমজীবী মানুষের ইতিহাস। বুর্জ খলিফার ইতিহাস নয়, তাই না? তুমি কর্পোরেশনের সাথে হাত মিলিয়েছিলে সেই রাত্রে, যেদিন তেভা ভারাভের ভিতর চালান হয়েছিল আমার হাইবারনেটেড শরীর। পাল্টা আঘাত ফিরিয়ে দেওয়ার দিনে, তোমার মেম্বারশিপ কোডের অ্যালগারিদম মেনেই (যা আমি পাল্টাতে চাইলেও পারিনি বা পারলেও চাইনি, কারণ আমি আসলে আমি নই, করোনাতে নির্বাসিত একটি প্রাণ মাত্র), তুমিও পার পাবেনা, প্রিয়তমা। তবে কর্পোরেশন ছাই হয়ে গেলেও, একদিন, আমার বিশ্বাস, আমাদের দেখা হবে। আমাদের দেখা হবে কারণ কবিতার তেজস্ক্রিয়তায় কিছু ধুলোর কণা ছিটকে বেরিয়ে আসবে তেভা ভারাভের দিকে, তোমার শরীরের কোনো কণা, যার নাম নেই কোনো, হয়তো তাও ছিটকে ঢুকে আসবে আর আমরা মিলিত হব করোনার বায়ুমন্ডলে, অশরীরে। আমরা নিজেদের চিনে নেব পাসওয়ার্ড দিয়ে। তেভা ভারাভের সুড়ঙ্গগাত্র থেকে প্রতিফলিত হবে এক খসখসে অস্ফুট স্বর, “ওয়েলকাম রোজবাড”।

Softcover Trade Book PSD Mockup - Aparthibo

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s